লেনদেন কাকে বলে? লেনদেনের বৈশিষ্ট্য? লেনদেনের ফলাফল?

অর্থ বা অর্থের অংকে পরিমাপযোগ্য যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্ম প্রক্রিয়াই হলো লেনদেন। লেনেেদন হিসাব প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি বা উপাদান লেনদেন বা Transaction এর অভিধানিক অর্থ হলো আদানপ্রদান। লেনদেন শব্দটি লেন এবং দেন শব্দ দুটির একত্রিত রূপ। লেন অর্থ নেয়া বা আদান এবং দেন অর্থ দেওয়া বা প্রদান করা। সুতরাং লেনদেন শব্দটি ব্যাখ্যা করলে এর আভিধানিক ভাবার্থ পাওয়া যায়।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে শুধুমাত্র আদানপ্রদানকেই লেনদেন বলা যাবে না। লেনদেন বলতে হলে ঘটনার সাথে আর্থিক বিষয় সংশ্লিষ্ট থাকবে এবং ঐ ঘটনা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে।

লেনদেন কাকে বলে :-

এল. সি ক্লোপারের মতে, “অর্থের আদানপ্রদান বা অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় এরূপ দ্রব্য বা সেবার আদানপ্রদানের দ্বারা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে এরূপ আদানপ্রদানকে লেনদেন বলে।

লেনদেন কাকে বলে এ সম্পর্কে Kieso and Weygandt বলেছেন, (Transaction are the economic events of an enterprise that are recorded) অর্থাৎ " লেনদেন হলো প্রতিষ্ঠানের সেই আর্থিক ঘটনা যা লিপিবদ্ধ করা হয়।"

আরও পড়ুন :- মূলধন ও মুনাজাতীয় কারবারের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

লেনদেন কত প্রকার ও কি কি :-

লেনদেনের প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে এর শ্রেণীবিভাগ করা যায়। নিম্নে লেনদেনের শ্রেণীবিভাগ বর্ণনা করা হলো -

১. সংঘটনের ভিত্তিতে লেনদেনকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- বহিঃলেনদেন ও আন্তঃলেনদেন।

ক) বহি:লেনদেন (External Transaction) :-

যে লেনদেন প্রতিষ্ঠানের বাইরের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘটিত হয় তাকে বহিঃলেনদেন বলে। সাধারণত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, অর্থ আদান-প্রদান ইত্যাদি লেনদেন বাইরের লোকদের সাথে সংঘটিত হয়।

খ) আন্তঃলেনদেন (Internal Transaction) :-

প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সংঘটিত লেনদেনকে আন্তঃলেনদেন বলে। এ জাতীয় লেনদেন সাধারনত অদৃশ্য লেনদেন হয়। যেমন- সম্পত্তির অবচয়।

২. পরিশোধের ভিত্তিতে লেনদেনকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- নগদ লেনদেন ও ধারে লেনদেন।

ক) নগদ লেনদেন ( Cash Transaction) :-

যে লেনদেনে নগদ টাকা আদান-প্রদান হয় তাকে নগদ লেনদেন বলে। যেমন, নগদে পণ্য বিক্রয়।

খ) ধারে লেনদেন (Credit Transaction) :-

যেসব লেনদেনে তাৎক্ষণিকভাবে নগদ অর্থ আদান-প্রদান হয় না তাকে ধারে লেনদেন বলে। যেমন, ধারে পণ্য ক্রয়।

৩. দৃশ্যমানতার ভিত্তিতে লেনদেনকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান লেনদেন।

ক) দৃশ্যমান লেনদেন (Tangible Transaction) :-

যে সমস্ত লেনদেনের প্রভাব বা ফলাফল দৃষ্টিগোচর হয় তাদের দৃশ্যমান লেনদেন বলে। যেমন, পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি।

খ) অদৃশ্যমান লেনদেন (Intangible Transaction) :-

যে সব লেনদেনের প্রভাব বা ফলাফল দৃষ্টিগোচর হয় না তাদের কে অদৃশ্যমান লেনদেন বলে। যেমন, সম্পত্তির অবচয়।

৪। উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে লেনদেনকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত লেনদেন।

ক) ব্যবসায়িক লেনদেন (Business Transaction) :-

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন যে সমস্ত লেনদেন সম্পন্ন করে সেগুলোকে ব্যবসায়িক লেনদেন বলে। যেমন- ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি।

খ) ব্যক্তিগত লেনদেন (Personal Transaction) :-

যে সব লেনদেন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন যাপনের জন্য সংঘটিত হয় সে সব লেনদেনকে ব্যক্তিগত লেনদেন বলে। যেমন- চাউল ক্রয়, বাড়ী ভাড়া প্রদান ইত্যাদি।

৫। উপযোগিতার ভিত্তিতে লেনদেনকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- মুনাফা ও মূলধন জাতীয় লেনদেন।

ক) মুনাফাজাতীয় লেনদেন (Revenue Transaction) :-

যে সমস্ত লেনদেনের ফলাফল স্বল্পকালব্যাপী তথা একটি আর্থিক বৎসরে শেষ হয় সে সব লেনদেনকে মুনাফা জাতীয় লেনদেন বলে। যেমন- বেতন প্রদান।

খ) মূলধন জাতীয় লেনদেন (Capital Transaction) :-

যে সব লেনদেনের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী তথা একাধিক আর্থিক বৎসর পর্যন্ত বজায় থাকে সে সব লেনদেনকে মূলধন জাতীয় লেনদেন বলে। যেমন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, দালান নির্মাণ ইত্যাদি।
লেনদেন কাকে বলে

লেনদেনের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য :-

হিসাববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক ব্যবহৃত শব্দ হলো লেনদেন। এর আভিধানিক অর্থ হলো গ্রহণ ও প্রদান বা আদান-প্রদান বা বিনিময়। কোনো একটি ঘটনা লেনদেন হতে হলে তার বেশ কতকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। নিম্নে লেনদেনের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো

১. আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন (Change in financial position) :-

কোনো ঘটনা যদি কারবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করে তবে তাকে লেনদেন বলে। এ পরিবর্তন দু'ভাবে হতে পারে

(ক) পরিমাণগত পরিবর্তন :-

যে পরিবর্তনের ফলে হিসাব সমীকরণের সম্পত্তি ও দায় উভয়েরই পরিবর্তন হয়, তাকে পরিমাণগত পরিবর্তন বলে।

যেমন- ধারে অফিসের জন্য ৪০,০০০ টাকার একটি কম্পিউটার ক্রয়। এর ফলে সম্পত্তি (কম্পিউটার) বৃদ্ধি পায় এবং অপরপক্ষে দায় (পাওনাদার/ প্রদেয় হিসাব) বৃদ্ধি পায়।

(খ) কাঠামোগত পরিবর্তন :-

এমন অনেক লেনদেন আছে যা মালিকানা স্বত্বের কোনো পরিবর্তন করে না, শুধুমাত্র সম্পদ বা দায়ের পরিবর্তন করে।

যেমন- অফিসের জন্য নগদে ২০,০০০ টাকার আসবাবপত্র ক্রয় করা হলো। এর ফলে একটি সম্পত্তি (আসবাবপত্র) বৃদ্ধি পায়; অন্যদিকে অপর সম্পত্তি (নগদ) হ্রাস পায়।

২. অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপযোগ্য (Measurable in terms of money) :-


কোনো ঘটনা লেনদেন হতে হলে তা টাকায় পরিমাপযোগ্য হতে হবে। টাকায় পরিমাপ করা না গেলে তাকে লেনদেন বলা যাবে না।

যেমন- দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ের পরিচালক মারা গেল। এতে ব্যবসায়ের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। কিন্তু এ ক্ষতি অর্থ দ্বারা পরিমাপযোগ্য নয়। তাই এই ঘটনা লেনদেন নয়।

৩. দ্বৈতসত্তা (Dual aspect) :-

প্রতিটি লেনদেনের দু'টি পক্ষ থাকে। একটি পক্ষ সুবিধা গ্রহণ করে এবং অপর পক্ষ সুবিধা প্রদান করে। দুটি পক্ষ ছাড়া কোনো লেনদেন হতে পারে না।

যেমন- ভাড়া প্রদান ১,০০০ টাকা। এ ঘটনার দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষ ভাড়া, অপর পক্ষ নগদান টাকা।

৪. স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র (Self sufficient and independent) :-

একটি লেনদেনের সাথে অপর এক বা একাধিক লেনদেনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে প্রতিটি লেনদেন হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র।

যেমন- আরাফাত, তানভিরের নিকট হতে ৫০০ টাকার পণ্য ধারে ক্রয় করে। কয়েকদিন পর এর মূল্য পরিশোধ করে। এখানে দু'টি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও একটি অন্যটি হতে আলাদা ও স্বতন্ত্র।

৫. লেনদেনের দৃশ্যমান (Visibility of transaction) :-

লেনদেনের সাথে আর্থিক অবস্থার যে পরিবর্তন হয় তা সর্বদাই দৃশ্যমান নাও হতে পারে। অদৃশ্যমান ঘটনাও থাকতে পারে।

যেমন-স্থায়ী সম্পত্তির অবচয় একটি অদৃশ্যমান ঘটনা।

৬. অতীত ও ভবিষ্যৎ ঘটনা (Historical and future event) :-

যে সকল ঘটনা ঘটে গিয়েছে সে সকল ঘটনাকে অতীত বা ইতিবৃত্তীয় ঘটনা বলে। ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া আর্থিক ঘটনাকে লেনদেন বলা হয়। আবার ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন ঘটনাকেও লেনদেন রূপে গণ্য করা হয়।

যেমন- অনাদায়ী পাওনা সঞ্চিতি।

৭. প্রামাণ্য দলিল (Documentary evidence) :-

কোনো ঘটনা লেনদেনরূপে গণ্য হতে গেলে সেটির স্বপক্ষে অবশ্যই প্রমাণ থাকতে হবে।

যেমন- ধারে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে চালান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।



লেনদেনের ফলাফল বা প্রভাব :-

একটি কারবারি লেনদেন সংগঠিত হওয়ার ফলে ব্যবসায়ে আর্থিক পরিবর্তন আসে। এ আর্থিক পরিবর্তনকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

১. কাঠামোগত পরিবর্তন :-

ব্যবসায়ের কাঠামো বলতে এর সম্পদ ও মালিকানা স্বত্বার অবস্থানকে বোঝায়। লেনদেন সংগঠিত হওয়ার ফলে তাতে লাভ-লোকসানের কোনো পরিবর্তন না হয়েও যদি ব্যবসায়ের সম্পত্তিতে পরিবর্তন আসে তবে তা ব্যবসায়ের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায়।

যেমন- নগদ টাকা দিয়ে একখণ্ড জমি ক্রয় করা হলো। এখানে নগদ টাকা কমে গেল এবং জমি নামের একটি নতুন সম্পত্তি যোগ হলো। জমি ও নগদ টাকার আয়ক্ষমতা অসমান হতে পারে বিধায় এ সম্পত্তি পরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ের আয়ের ক্ষমতাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

২. স্বত্ত্বার পরিবর্তন :-

লেনদেনের ফলে ব্যবসায়ের আয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। আর আয় কিংবা লোকসান ব্যবসায়ের স্বতার পরিবর্তন আনে, কাজেই বলা যায়, লেনদেন ব্যবসায়ের লাভ-লোকসান ঘটায় যা ব্যবসায়ের মৃত্যুর পরিবর্তন ঘটায়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় - ১,০০,০০০ টাকার মাল মন্দা বাজারে বিক্রয় করে ৬০,০০০ টাকা পাওয়া গেল। ফলে ৪০,০০০ টাকা লোকসান হলো। এ লোকসানের ফলে মালিকানা 80,000 কমে গেল।

৩. অদৃশ্য পরিবর্তন :-

ব্যবসায়ে লেনদেন সংগঠিত হওয়ার ফলে শুধু যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এমন নাও হতে পারে অনেক সময় লেনদেনের ফলাফল অদৃশ্যও হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্যবসায়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে এর যে মূল্যমান হ্রাস পায় তাকে অবচয় বলে। এ অবচয় ব্যবসায়ের একটি খরচ এবং এটা লেনদেন হিসাবে লিপিবদ্ধ করতে হয়। এ লেনদেনের ফলে ব্যবসা হতে কোনো নগদ সম্পদ ব্যয় হয় না বা কোনো বাহিরের পক্ষও জড়িত হয় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ