শেয়ার বাজার বা স্টক এক্সচেঞ্জে কাকে বলে? শেয়ার বাজারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা?

শেয়ার বাজার বা স্টক এক্সচেঞ্জ কাকে বলে :-

শেয়ার বাজার বা স্টক এক্সচেঞ্জে এমন একটি স্থান যেখানে বিভিন্ন সসীম দায়বদ্ধ কোম্পানি (পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি) যারা স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত তাদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। একে পুঁজি বাজারও বলা হয়।

শেয়ার বাজারে সুনির্ধারিত নিয়মনীতি অনুসরণ করে শেয়ার, স্টক, বন্ড, ঋণপত্র ইত্যাদি ক্রয়বিক্রয় কার্য পরিচালিত হয়ে থাকে। শেয়ার বা স্টকের ক্রয়বিক্রয় ছাড়াও এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজও স্টক এক্সচেঞ্জ করে থাকে। স্টক এক্সচেঞ্জ মূলত একটি মাধ্যমিক বাজার (Secondary market)। এতে প্রাথমিক বাজারের (Primary market) বিক্রিত শেয়ার বা ঋণপত্র ক্রয়বিক্রয় কার্য চলে।

বিভিন্ন লেখক স্টক এক্সচেঞ্জকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে এর কয়েকটি উপস্থাপন করা হলো -

হ্যারল্ড (Dr. Harold) এর মতানুসারে “স্টক এক্সচেঞ্জ হলো একটি সংগঠিত পুঁজি বাজার যেখানে পাবলিক কোম্পানিসমূহের স্টক ও ঋণপত্র কেনাবেচা হয়।"

হেস্টিংস (Hastings) এর মতে, “শেয়ার বাজার হলো এমন একটি স্থান যেখানে শেয়ার বা বন্ডের ক্রেতা এবং বিক্রেতা বা তাদের প্রতিনিধিগণ লগ্নিপত্র ক্রয়-বিক্রয় সংশ্লিষ্ট লেনদেনে অংশগ্রহণ করে।"

স্টক এক্সচেঞ্জের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অধ্যাপক মুখার্জী বলেন “যে সংহত বাজারে সরকারি ও বেসরকারি পাবলিক কোম্পানির শেয়ার, স্টক, ডিবেঞ্চার ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় হয় তাকে শেয়ার বাজার বলে‌।"
শেয়ার বাজার বা স্টক এক্সচেঞ্জে কাকে বলে

উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, স্টক এক্সচেঞ্জ হলো কৃত্রিম ও স্বতন্ত্র সত্তাবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বাজার। যাতে তালিকাভুক্ত সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহ তাদের শেয়ার, স্টক, সিকিউরিটি ও ডিবের নিয়মিতভাবে নির্ধারিত নিয়মে পরস্পরের মধ্যে ক্রয় ও বিক্রয় করে।

এক্সচেঞ্জ নিজে কখনো শেয়ার, স্টক, সিকিউরিটি ও ডিবেঞ্চার ক্রয়-বিক্রয়ে অংশ নেয় না। দেশীয় পুঁজির কার্যকর আন্তঃ বিনিয়োগের মূল মাধ্যম হলো স্টক এক্সচেঞ্জ।

শেয়ার বাজারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা :-

শেয়ার স্টক, ডিবেঞ্চার এবং সিকিউরিটি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে শেয়ার বাজার দেশের শিল্প-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শেয়ার বাজারকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পরিমাপক হিসেবে গণ্য করা হয়। শেয়ার বাজারের গুরুত্বকে ৪টি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। যথা
  • কোম্পানির দৃষ্টিকোণ:
  • বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ:
  • আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ এবং
  • জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ।

নিম্নে এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো -

কোম্পানির দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব :-

ব্যবসায় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের লক্ষ্যে তালিকাভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলো শেয়ার বাজারে তাদের শেয়ার, ঋণপত্র, স্টক, লগ্নিপত্র কেনা-বেচা করে। কোম্পানির মূলধন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নির্ভর করে শক্তিশালী এবং কার্যকর শেয়ার বাজারের উপর। কোম্পানির দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের শুরুভুকে আমরা নিম্নরূপে আলোচনা করতে পারি

১. শেয়ার বাজার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার, স্টক, ঋণপত্র ও লগ্নিপত্র বিক্রয় করে প্রয়োজনীয় স্থায়ী ও চলতি মূলধনের যোগান দেয়।

২. কোম্পানির শেয়ার, স্টক, ঋণপত্র এবং লগ্নিপত্রের প্রকৃত মূল্য শেয়ার বাজরের মূল্যজ্ঞাপন পত্র এবং মূল্য তালিকা থেকে জানা যায়। ফলে ভালো কোম্পানির শেয়ার, স্টক ইত্যাদি বেশি বিক্রি হয়।

৩. কোম্পানি জরুরী প্রয়োজন মনে করলে শেয়ার বাজারে তার শেয়ার, ঋণপত্র, লগ্নিপত্র বিক্রির মাধ্যমে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

৪. কোম্পানির অর্জিত মুনাফার উপর বণ্টিত লভ্যাংশ শেয়ার বাজারের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

৫. ভবিষ্যতে কোম্পানির সম্প্রসারণ, আধুনিকীকরণ ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের প্রয়োজনে শেয়ার বাজারে নতুন শেয়ার বিক্রি করে সহজেই প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারে।

৬. শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির ফলে বাজারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর গুরুত্ব ও সুনাম বৃদ্ধি পায়।

বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব :-

বিনিয়োগকারীদের কেন্দ্র করেই শেয়ার বাজারের কার্যক্রম আবর্তিত হয়। তাই ছোট বড় সকল বিনিয়োগকারীর নিকটই শেয়ার বাজারের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। নিম্নে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :-

১. শেয়ার বাজার বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপদ বিনিয়োগ সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দান করে।

২. শেয়ার বাজার বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে। ফলে লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ন্যায্যমূলো শেয়ার, ঋণপত্র, স্টক, সিকিউরিটি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে।

৩. বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনে তালিকাভুক্ত শেয়ার জামানত রেখে ঋণগ্রহণ করতে পারে।

8. শেয়ার বাজারের দালাল, জবার এবং বিশেষজ্ঞদের নিকট হতে বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহন করতে পারে।

৫. বিনিয়োগকারীগণ পছন্দমত শেয়ার, স্টক, ডিবেঞ্চার ইত্যাদি হস্তান্তরের সুবিধা পায়।

৬. শেয়ার বাজারে ইস্যুকৃত লাভজনক শেয়ার, স্টক, ঋণপত্র ও সিকিউরিটিতে সদস্যদের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে বেকার যুবকগণ আর্থিক সুবিধা লাভ করতে পারে।

আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব :-

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে শেয়ার বাজার নিম্নরূপ ভূমিকা পালন করে থাকে-

১. শেয়ার বাজার দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে এবং ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়।

2. শেয়ার বাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকল্পে উৎপাদনশীল শিল্প ও বাণিজ্যের প্রয়োজনীয় মূলধনের যোগানের ব্যবস্থা করে।

৩. শেয়ার বাজার দেশের পুঁজি বাজার গঠন এবং পুঁজির কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করে।

8. জনগণের মধ্যে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ অভ্যাস গড়ে তোলে, যা জাতীয় উন্নয়নের সহায়ক।

৫. শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকৃত অর্থ দেশের বেকার যুবক ও অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবীদের জন্য আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

৬. জনগণ তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করে। ফলে তাদের সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব :-

জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় জীবনে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব অনেক। যা আমরা নিম্নরূপে আলোচনা করতে পারি

১. শেয়ার বাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দর্পন এবং পরিমাপক হিসেবে কাজ করে।

2. সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, স্টক, ঋণপত্র ও লগ্নিপত্র শেয়ার বাজারের মাধ্যমে ক্রয় বিক্রয় করে দেশের প্রয়োজনীয় মূলধন প্রাপ্তি সহজ হয়।

৩. এই বাজার থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নে ব্যয় করতে পারে।

8. শেয়ার বাজার থেকে সরকার প্রচুর রাজস্ব ও কর পেয়ে থাকে যা দেশের উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করা যায়।

উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শেয়ার বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ শেয়ার বাজারের কার্যক্রমে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয়। তাই বলা যায় যে, শেয়ার বাজারই হলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

স্টক এক্সচেঞ্জে ক্রয় বিক্রয়ের নিয়মাবলি বা লেনদেন পদ্ধতি :-

স্টক এক্সচেঞ্জে ক্রয়বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুনির্ধারিত নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ লেনদেন পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে সাধারণত নিম্নলিখিত ৩টি পদ্ধতিতে এ লেনদেন কার্য সম্পাদিত হয়ে থাকে:

১. ডাক পদ্ধতি।
২. লেনদেন স্থান পদ্ধতি এবং
৩. জবিং পদ্ধতি।

১. ডাক পদ্ধতি (Call-over system) :-

শেয়ার লেনদেনের প্রাচীন পদ্ধতি হচ্ছে ডাক পদ্ধতি। যে সব স্টক এক্সচেঞ্জ আকারে তেমন বড় নয়, তালিকাভুক্ত সদস্য সংখ্যা কম, লেনদেনের পরিমাণও বেশি নয়, সেসব স্টক এক্সজেঞ্জে ডাক পদ্ধতি বা কল-ওভার পদ্ধতিতে শেয়ার ক্রয়বিক্রয় হয়।

এ পদ্ধতিতে স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তাগণ পর্যায়ক্রমে এক একটি কোম্পানির শেয়ার বা ঋণপত্রের দাম ঘোষণা করে নিলাম ডাকতে থাকেন। সাধারণত ক্রেতাগণ ঐ নিলামে অংশ নেবার উদ্দেশ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বা অনুমোদিত ব্যক্তি জবার, কিংবা দালালের স্মরণাপন্ন হন। ডাকের মাধ্যমে শেয়ার বা ঋণপত্রের মূল্য নির্ধারিত হলে নতুন মূল্যসহ ক্রয়বিক্রয়ের আদেশ লিপিবদ্ধ করা হয়। এ পদ্ধতিকে ক্রাই আউট (cry-out) পদ্ধতিও বলা হয়।

২. লেনদেন স্থান পদ্ধতি (Trading post system) :-

এ পদ্ধতি ডাক পদ্ধতির সম্প্রসারিত রূপমাত্র। শেয়ার ক্রয়বিক্রয়ের এ পদ্ধতি ডাক পদ্ধতির মতোই। এ ক্ষেত্রে যে পার্থক্যটুকু রয়েছে তা হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে স্টক এক্সচেঞ্জ এর ফ্লোরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। কোন ভাগে কোন সিকিউরিটি ক্রয়বিক্রয় হবে এক্ষেত্রে তা পূর্বেই নির্ধারণ করে নেয়া হয়। স্টক এক্সচেঞ্জের আকার বড় হলে কিংবা লেনদেনের পরিমাণ বেশি হলে লেনদেন স্থান পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

৩. জবিং পদ্ধতি (Jobbing system) :-

এ পদ্ধতিতে জবার (jobber) এর মাধ্যমে শেয়ার ক্রয়বিক্রয় কার্য চলে। জবার হচ্ছে শেয়ার বাজারের একজন অনুমোদিত সদস্য। তারা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রত্যক্ষ শেয়ার ব্যবসায়ী। জবারগণ দালালের মাধ্যমে ক্রেতাগণের কাছে শেয়ার ক্রয়বিক্রয় করে।

দালালরা ক্রেতা ও জবারদের মধ্যস্থকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং সেজন্য তারা কমিশন পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দালালগণ জবারদের কাছ থেকে ক্রেতাদের বা বিক্রেতাদের পছন্দনীয় শেয়ারেরর দাম জানতে চান। জবারের সাথে দরকষাকষি করে একমত হলে দালাল মক্কেলের পক্ষে আলাদাভাবে ক্রয় বা বিক্রয় চুক্তি করেন।

চুক্তিতে দালাল, জবার এবং মক্কেলের নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য বিবরণ, শেয়ার বা ঋণপত্রের মূল্য, দালালের কমিশন এবং লেনদেনের তারিখ উল্লেখ থাকে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে এ পদ্ধতিতে শেয়ার বা ঋণপত্র ক্রয়বিক্রয় হয়ে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ