ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট কাকে বলে? ব্যবস্থাপনা কত প্রকার? ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্টের পরিধি?

ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট একটি সার্বজনীন বিষয়। মানব জীবনের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই কোনো না কোনভাবে ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব বিরাজমান মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের যেমন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি ব্যবসায় সংগঠন, রাষ্ট্র পরিচালনায়, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামরিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও ব্যবস্থাপনা এক অপরিহার্য বিষয়।

ব্যবস্থাপনা কোনো ব্যক্তির জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেমন প্রয়োগযোগ্য তেমনি পারিবারিক ক্ষেত্রে, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে প্রয়োগ করা যায়।

নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে ব্যক্তি জীবনকে যেমন সমৃদ্ধশালী করা যায় তেমনি সামাজিক সংগঠন। যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সমিতি, ধর্মীয় সংগঠন পরিচালনায় ব্যবস্থাপনার রীতিনীতি অনুসরণযোগ্য।

আবার উৎপাদন, বণ্টন, পরিবহন, ব্যাংকিং, বিমা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি ব্যবসায়িক কার্যে জড়িত সংগঠনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকলে সফলতার সাথে ব্যবসায় কার্য পরিচালনা করা যায় না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনও সুষ্ঠু এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার অভাবে অচল হয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে এ পোস্টে আমরা ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করবো।
ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট কাকে বলে

ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট কথার অর্থ :-

ব্যবস্থাপনার ইংরেজী 'Management' শব্দটি ইতালীয় 'Maneggiare' বা 'Manage' ও 'Manager' শব্দ সমূহ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। Maneggiare শব্দের অর্থ হচ্ছে অশ্ব পরিচালনা করা (to trainup the horse)।

তবে কালের বিবর্তনে এটা মূলত মানব জাতিকে পরিচালনার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পরের শব্দ দু'টি অর্থাৎ Manage ও Manager এর অর্থ হলো যথাক্রমে 'পথ প্রদর্শক'’ ও ‘পরিচালক' যার সাথেও ব্যবস্থাপনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন কাজের মধ্যে তার অধীনস্থদের নেতৃত্ব প্রদান ও পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট কাকে বলে :-

একটি প্রতিষ্ঠান উদ্দেশ্য অর্জনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যেসব কার্যাবলি সম্পাদন করে সেগুলোকে একত্রে ব্যবস্থাপনা বলে।

প্রশ্ন হতে পারে প্রয়োজনীয় সম্পদগুলো কী? প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ, বস্তুগত সম্পদ, আর্থিক সম্পদ ও তথ্য সম্পদ হলো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সম্পদ। আর এ সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা, সংগঠন, কর্মসংস্থান, নির্দেশনা ও নেতৃত্বদান, সমন্বয় সাধন, প্রেরণা এবং নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখা করেছেন। এবার আসুন সেগুলো সম্পর্কে জেনে নিই।

আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল (Henri Fayol) এর মতে, "ব্যবস্থাপনা হলো পূর্বানুমান ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, সংগঠিত করা, নির্দেশ প্রদান, সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণ।"

জর্জ আর, টেরি (George R. Terry) বলেছেন, "ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি স্বতন্ত্র সামাজিক প্রক্রিয়া যা মানুষ ও সম্পদসমূহের সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের নিমিত্তে পরিকল্পনা, সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণ কাজের সাথে সম্পৃক্ত।"

আরও পড়ুন:- অংশীদারি ব্যবসায় বিলোপসাধন কি?

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উপকরণ তথা মানব সম্পদ, যন্ত্রপাতি, পদ্ধতি ইত্যাদির কাম্য ব্যবহার কল্পে কর্মীবৃন্দের যৌথ প্রচেষ্টায় ব্যবহৃত পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা, প্রেষণা, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট সামাজিক প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট বলে।

ব্যবস্থাপনা কত প্রকার :-

প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকারের ব্যবস্থাপক থাকেন। প্রতিষ্ঠানের স্তর অনুযায়ী ব্যবস্থাপকদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।। ব্যবস্থাপনার স্তর বলতে প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান নানা ধরনের ব্যবস্থাপক থাকে তাদের পদমর্যাদাগত অবস্থানকে বোঝানো হয়। বড় প্রতিষ্ঠানে সাধারণত তিন ধরনের ব্যবস্থাপনার স্তর বিদ্যমান উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন। এই স্তরের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারিত হয়।

১. উচ্চ ব্যবস্থাপনা (Top Management) :-

উচ্চ ব্যবস্থাপনা স্তরের ব্যবস্থাপকগণ সংগঠনের নীতিমালা প্রণয়ন ও সকল কাজের সমন্বয় সাধন করেন। এ স্তর পুরো সংগঠনের কাজের জন্য দায়ী। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভেদে ব্যবস্থাপকদের পদবির নাম ভিন্ন হতে পারে।

একটি বেসরকারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে এ স্তরে সাধারণ প্রেসিডেন্ট, বোর্ড অব ডাইরেক্টরস-এর চেয়ারম্যান, বোর্ডের নির্বাহী কমিটি, প্রধান নির্বাহী অফিসার এবং মুখ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকেন, এরা সাধারণত কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত। এ স্তরের ব্যবস্থাপকগণ প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

২. মধ্যম ব্যবস্থাপনা (Middle Management) :-

মধ্যম ব্যবস্থাপনা স্তরে সবচেয়ে বেশি ব্যবস্থাপক থাকেন। বিভাগীয় প্রধান, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, কর্মী পরিচালক, উৎপাদন ম্যানেজার ইত্যাদি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নীতি প্রণয়ন এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। এরপর মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপকগণ এ নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা ও কার্য পদ্ধতি তৈরি করেন। এরপর বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন:- ব্যবস্থাপক কাকে বলে?

৩. অপারেটিং ব্যবস্থাপনা (Operating Management) :-

ব্যবস্থাপনার তৃতীয় স্তর হলো অপারেটিং স্তর। এ স্তর সংগঠনের নিম্ন স্তরের ব্যবস্থাপকদের সাথে সম্পর্কিত। এ স্তরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ; যথা-সহকারী ব্যবস্থাপক, জুনিয়র এক্সিকিউটিভ, সুপারভাইজার বা ফোরম্যান। এরা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন।

ব্যবস্থাপনার পরিধি বা আওতা :-

ব্যবস্থাপনা হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সুস্পষ্টভাবে পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের নিমিত্তে মানব সম্পাদিত কার্যাবলীর নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া। সুতরাং এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবস্থাপনার পরিধি বর্ণনা করা হল:

১. ব্যক্তি ও সংগঠনের ভিত্তিতে পরিধি :-

কোন উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য একদল ঐক্যবদ্ধ লোক থেকে সংগঠনের জন্ম হয়। মুনাফা বা অমুনাফাভিত্তিক উভয় সংগঠনের ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা পরিব্যপ্ত। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলোঃ

(ক) ব্যক্তি জীবন :-

যে কোন ব্যক্তির জীবনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুষ্ঠুভাবে জীবনকে চালাতে বা পরিচালনা করতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকীয় জ্ঞানের প্রয়োগ অপরিহার্য।

(খ) পারিবারিক জীবন :-

একটি পরিবারকে বিশেষ করে যৌথ পরিবারে গৃহকর্তা বা কর্ত্রীকে ব্যবস্থাপনার সর্বজনীন কার্যাবলী প্রয়োগ করতে হয়।

(গ) সামাজিক সংগঠন :-

বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমুখী সামাজিক সংগঠন যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সমিতি, দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করতে হয়।

(ঘ) রাষ্ট্র বা সরকার :-


যে কোন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। এজন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেছেন, “ভাল ব্যবস্থাপনা ছাড়া একটা ভাল সরকার বালির উপর তৈরী বাড়ির মত।"

(ঙ) ব্যবসায় সংগঠন :-

আধুনিক বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসায় সাংগঠনিক কার্যের প্রতিটা স্তরেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ অনস্বীকার্য।

2. কাজের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনার পরিধি :-

বিখ্যাত ব্যবস্থাপনাবিদ পিটার এফ. ড্রাকারের মতে, নিম্নোক্ত তিন ধরনের কাজ ব্যৱস্থাপনা সম্পাদন করে।

(ক) প্রতিষ্ঠান পরিচালনা :-

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অর্থ হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যাবতীয় কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা। এর মূল উদ্দেশ্য হবে গ্রহণযোগ্য মূল্যে পণ্য ও সেবা পরিবেশন করা এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। এ লক্ষ্যে গৃহীত সকল কার্যই ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত।

(খ) ব্যবস্থাপকের ব্যবস্থাপনা :-

প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপকীয় কার্যে নিয়োজিত সকল নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও ভারসাম্য রক্ষা করা ব্যবস্থাপনার কাজ। এজন্য ব্যবস্থাপনা প্রত্যেক নির্বাহীর জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, নেতৃত্ব, নির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদানসহ তাদের কার্যের তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

(গ) শ্রমিক কর্মী ব্যবস্থাপনা :-

প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মীকে একজন মানুষ ও একটি সম্পদ এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে হয়। তাই দেখা যায় যে, তাদের সাথে উঁচু স্তরের ব্যবস্থাপকগণকে মোট কার্যসময়ের শতকরা ৬০ হতে ৮০ ভাগ সময় আলাপ আলোচনা ও যোগাযোগ সাধনে ব্যয় করতে হয়।

এছাড়া কর্মীদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, নেতৃত্ব দান, প্রেষণা, কর্মী পরিচালনা, বদলি, বরখান্ত, ছাঁটাই, অবসর গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের মত মৌলিক কার্য ব্যবস্থাপনার আওতাধীন।

৩. কৌশল প্রয়োগের ভিত্তিতে পরিধি :-

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বহুমুখী কার্য সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল গ্রহণ করতে হয়, যা ব্যবস্থাপনার আওতাধীন। এরূপ কৌশল গ্রহণের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, বিভিন্ন ধরনের পলিসি, বাজেট, উপদেষ্টা নীতি নির্ধারণ, বিভাগীয় করণ, কমিটি গঠন, প্রয়োজন অনুসারে কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, দায়িত্ব ও কর্তব্য বন্টন, নেতৃত্ব ও প্রেষণাদান, পরিদর্শন ইত্যাদি কর্মসূচী গ্রহণ করতে হয়।

৪. কার্যবিভাগের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিধি :-

প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়; যেমন- উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, বিক্রয় ও বিপণন ব্যবস্থাপনা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, জন-সংযোগ ও শ্রমিক-কর্মী ব্যবস্থাপনা, অফিস ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা পরিব্যপ্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ