ব্রত কি বা কাকে বলে? ব্রতের উদ্ভব ও শ্রেনীবিভাগ | ব্রতের বৈশিষ্ট্য

ব্রত কি বা কাকে বলে :-

ব্রত কথাটির সাধারণ অর্থ নিয়ম সংযম। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ এই বাংলা। এমন মাস খুবই কমই আছে এই বাংলায়, যার কোন না কোনমাসে কোন ব্রতের অনুষ্ঠান হয় না। মূলত নারীর কামনা-বাসনা পূরণের জন্য কৃতা সম্পাদনই ব্রত। অর্থাৎ কোন কিছুর কামনা প্রার্থনায় নারীসমাজ আন্তরিকভাবে যে সকল ক্রিয়াচার পালন করে।

তা-ই অবনীন্দ্রনাথের মতে, কিছু কামনা করে যে অনুষ্ঠান সমাজে চলে তাকেই বলি ব্রত।"

"বু' ধাতু থেকে এত শব্দের উৎপত্তি। ব্রত কথাটির সাধারণ অর্থ নিয়ম বা সংযম। যে ব্রত পালন করে সে ব্রতী।

সাধারণত কোনকিছু কামনা করে দেবতার কাছে বিশেষ প্রার্থনা জানিয়ে (ক্ষেত্র বিশেষ আলপনা দিয়ে) কোন বিশেষ আচার পালন বা অনুষ্ঠান করা কিংবা পার্থিব কল্যাণ কামনায় দশে মিলে যে সামাজিক নিয়ম বা অনুষ্ঠান পালন করা হয় তাকে ব্রত বলা হয়।
ব্রত কি বা কাকে বলে

ব্রতের শ্রেণীবিভাগ :-

আমাদের দেশে চলিত ব্রতের শ্রেণীবিভাগ নিয়ে 'বাংলার ব্রত' গ্রন্থের শুরু। লেখক প্রথমে প্রচলিত ব্রতের প্রধান দুটি ভাগের কথা উল্লেখ করেছেন শাস্ত্রীয় ব্রত এবং যোধিদপ্রচলিত বা মেয়েলি ব্রত।

আর মেয়েলি ব্রত বলে প্রচলিত ব্রতকে তিনি আবার দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন কুমারী ব্রত এবং নারীব্রত।

বিভিন্ন প্রকার ব্রতের সংজ্ঞা :-

কুমারী ব্রত কাকে বলে :-

মূলত পাঁচ-ছয় থেকে আট-নয় বছরের অবিবাহিতা কুমারী মেয়েরা যে ব্রত গুলো পালন করে, তাকে কুমারী ব্রত বলে।

আরও পড়ুন :- লোকসাহিত্য কি?

নারী ব্রত কাকে বলে :-

আর মূলত পাঁচ থেকে আট-নয় বছরের তদর্ধ্বে বড়ো বয়সের মেয়েরা বিয়ের পর যে ব্রতগুলো পালন করে, তাদের তিনি নারী ব্রত বলে উল্লেখ করেছেন।

শাস্ত্রীয় ব্রত কাকে বলে :-

ভারতে আর্যদের অনুষ্ঠান, পুরাণ ভেঙে যে ব্রতের উদ্ভব, আচার-নিয়মের নিষ্ঠা যে ব্রতের মূল লক্ষ্য তাকে শাস্ত্রীয় ব্রত বলে।

মেয়েলি ব্রত কাকে বলে :-

অন্যদিকে মেয়েলি ব্রত ভারতের নির্বাসীদের অনুষ্ঠান, বৈদিক সুক্তের সঙ্গে মেয়েলি ব্রতের মিল লক্ষিত হলেও, মেয়েলি ব্রতের উদ্ভব বৈদিবসূক্ত নয়, এর মধ্যে একটা জাতির প্রাণের কথা, একটা স্বপ্ন যেন মুর্তরূপ পেতে চায়।

বাংলা ব্রতের বৈশিষ্ট্য :-

১- ব্রত একক ক্রিয়া অনুষ্ঠান নয়, একের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে ব্রতের অনুষ্ঠান।

২- ব্রতের মধ্যে সর্বদা একটা কামনা প্রকাশিত হয়। কামনা বাসনার বাস্তব রূপায়ণের জন্যই ব্রতের আয়োজন।

৩- বাংলা ব্রত বা বাংলার মেয়েলি ব্রতের কতকগুলো পর্যায় থাকে, আহরণ, আচরণ, কামনাজ্ঞাপন, ব্রতকথা শ্রবণ ইত্যাদি।

৪- আহরণ অর্থে, ব্রতে যা যা লাগবে তা সংগ্রহ করা। অর্থাৎ উপকরণ সংগ্রহ। ব্রতের উপকরণকে উপাচারও বলে। সাধারণত ব্রতের উপকরণ বা উপাচারের মধ্যে পড়ে— ঘট, আম্রপল্লব, ফুল, দুর্বা, ধান, প্রদীপ, তুলসী, বেলপাতা, সিদ্ধি, হরিতকি, তিল, দধি, মধু ইত্যাদি হল ব্রতের শিল্পকলার বা মঙ্গল কামনার উপকরণ। বাংলার ব্রতের উপকরণগুলি এদেশীয় আর্থ-সামাজিক পরিবেশ সংস্কৃতির এক চলমান চিত্র উদঘাটিত করে। ব্রতের শুরুতে এইসব উপকরণ উপচার সংগ্রহকে আহরণ বলে।

আরও পড়ুন :- লোকসংস্কৃতি কি?

৫- আহরণের পরের পর্ব আচরণ, আচরণ হল রঙের পালিত নিয়মবিধি। যে ব্রত পালন করে সেই হল ব্রতী। ব্রতী বা ব্রতিনীকে আহরণ কর্মের পাশাপাশি ব্রতের আচরণের প্রস্তুতি নিতে হয়। ব্রতী বা ব্রতিনী স্নান করে শুচিবস্ত্রে উপবাসী থেকে ব্রত পালন করে। ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে নারীদের ত্যাগ, নিষ্ঠা, সংযম, সুপ্ত কামনা-বাসনা কল্পনা এবং একাগ্রতার প্রকাশ ঘটে। মূল কথা হল এই যে, প্রাতঃস্নান, উপবাসী থাকা, ব্রতাচার পালন, আলপনা দেওয়া, পুকুর কাটা, ছড়া বলা, ব্রত কথা বলা বা শোনা ইত্যাদি হল ব্রতের আচরণীয় নিয়ম। আচরণ পর্বের মধ্যে দিয়ে ব্রতীর নিয়ম-নিষ্ঠা বা সংযমের প্রকাশ ঘটে।

৬- আচরণপর্বের অন্যতম প্রধান আচার আলপনা দেওয়া। আলপনায় ব্রতীর কামনার প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে। আলপনার অলংকরণের এক একটা চিত্রে যেমন আর্থ-সামাজিক দিকটি স্পষ্ট হয়, তেমনি এক একটা চিত্রে ব্রতীর কামনার নানা রূপ ধরা পড়ে।

৭- ব্রত যদিও কামনা-বাসনার আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া তবুও ব্রতের মধ্যে কবিতা, চিত্র, উপাখ্যান গদ্য পদ্য এবং মশুনশিল্প ইত্যাদির বহিঃপ্রকাশ হতে দেখা যায়। ব্রতের ছড়াগুলো সব এক রকম নয়। কোথাও সেগুলো সাধারণ ছড়া, কোথাও বা সেগুলো সংলাপধর্মী। নাটকের মতো পাত্রপাত্রী এবং নানা দৃশ্য ও অক্ষ্যভেদে সাজানো।

৮- ব্রতের মধ্যে পুরাকালের ধর্মানুষ্ঠানের সঙ্গে চিত্রকলা, নাট্যকলা, নৃত্যকলা, গীতবলা, উপন্যাস, উপাখ্যান সবই বর্তমান।

৯ - ব্রতের মধ্যে কেবল পুরাকালের ছবি নয়, বাংলা ব্রতে বাঙালির সমাজ জীবনের বহুমুখী চিত্র ধরা পড়ে। ব্রতের সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব এদিক থেকে ব্রতের ছড়ার মধ্যে ব্যক্তি মনের আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় সমাজ-মানসিকতা।

১০ - খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলি ঠিক কোনো দেবতার পুজো নয়।

১১ - খাঁটি ব্রতের লক্ষণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেছেন, খাঁটি ব্রতে ব্রতীর কামনার সঙ্গে ব্রতের সমস্তটার পরিষ্কার সাদৃশ্য থাকা চাই।

১২ - এছাড়া ব্রত হতে হলে একের কামনা অথবা একের মনের দোলা দশকে দুলিয়ে একটা ব্যাপার হয়ে নাচে গানে ভোজে ইত্যাদিতে অনুষ্ঠিত হওয়া দরকার।

ব্রতের উদ্ভব :-

কামনা-বাসনা পূরণের জন্য কৃত্যসম্পাদনই ব্রত। অর্থাৎ ব্রতের মধ্যে সর্বদাই কামনা-বাসনা পূরণের একটা প্রচেষ্টা থাকে। মানুষ আজীবন তার নানা কামনার চরিতার্থতার নানা ক্রিয়া করে চলেছে।

অবনীন্দ্রনাথ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এই কামনা-বাসনা চরিতার্থতা সাধনের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন ব্রতের উদ্ভবের ইতিহাস। অবনীন্দ্রনাথ সমাজতাত্ত্বিক এক ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অবরোহী পদ্ধতিতে অর্থাৎ সামান্য থেকে বিশেষে পৌঁছানোর সূত্র ধরে ব্রতের উদ্ভবের মধ্যে পৌঁছাতে চেয়েছেন।

কামনা-বাসনা চরিতার্থতার বৃহত্তর দিকের সমান্তরালে লোকায়ত যে রূপ, তার মধ্যে দিয়েই মেয়েলি ব্রতের উদ্ভব। নানা ঋতুর মধ্যে দিয়ে নানা ঘটনা মানুষের চিন্তাকে আকর্ষণ করেছে এবং এই সকল ঘটনার মূলে দেবতা-অপদেবতা নানা রকম কল্পনা করে নিয়ে তারা শস্য কামনায়, সৌভাগ্যকামনায় এমনি নানা কামনা চরিতার্থ করবার জন্য ব্রত করছে কী আর্য, কী অন্য ব্রত সব দলেই, এইটেই হল ব্রতের উৎপত্তির ইতিহাস।'


ব্রতের উদ্ভবের পিছনে আমাদের ভুল ধারণার নিরসন করে লেখক বলছেন, “আমরা মনে করি যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা ধর্ম ও নীতি শেখাতে মেয়েদের জন্যে আধুনিক কিন্ডারগার্টেন প্রণালীর মতো এত-অনুষ্ঠানগুলি আবিষ্কার করে গেছেন। শাস্ত্রীয় ব্রতগুলি কতকটা তাই বটে, কিন্তু আসল মেয়েলি রত মোটেই তা নয়। এগুলি আমাদের পূর্বপুরুষেরও পূর্বেকার পুরুষদের তখনকার, যখন শাস্ত্র হয়নি। হিন্দু ধর্ম বলে একটা ধর্মও ছিল না এবং যখন ছিল লোকেদের মধ্যে কতকগুলি অনুষ্ঠান, যেগুলির নাম ব্রত। সমাজবিজ্ঞানীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি নয়। কিছুটা ডাক ঢালাই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে অবনীন্দ্রনাথ ব্রতের উৎপত্তির কথাই মেনেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকেও ও অস্বীকার করেননি।

ভারতবর্ষে যুগে যুগে বিদেশি শক্তি এসে বাস করেছে, আক্রমণ করেছে, জনা করেছে, লুঠন করেছে, কেউ চলে গেছে, কেউ মিশে গেছে এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে। এমনিভাবে ভারতবর্ষের বাইরে থেকে আগত আর্যরা এদেশে এসে যাদের দেখা পেলেন, তাদের তাঁরা ডাকলেন 'অন্য ব্রত নামে।

এই আর্যরা এদেশে আসার আগে এদেশে দলে দলে এই সব 'অন্য ই-- ছেলেমেয়ে যুবকযুবতী, বুড়োবুড়ি, দলপতি, গোষ্ঠীপতি, যোদ্ধা, কৃষাণ-নিজেদের আচার-অনুষ্ঠান দেবতা-অপদেবতা কলাকৌশল ভয়ভরসা হাসিকান্না নিয়ে বাস করছিল।

এই আর্য ও অনার্য বা অন্যরতদের মধ্যে ঘটল ভাব-ভাবনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে ন-প্রদান। পুরাণের দেবদেবীদের উৎপত্তির ইতিহাস এই আদান প্রদানের ইতিহাস; ধর্মানুষ্ঠানের দিক দিয়ে শাস্ত্রীয় ব্রতগুলির ইতিহাসও তাই, কেবল এই মেয়েলি ব্রতগুলির মধ্যে দিয়ে আমরা সেই সব দিনের মধ্যে গিয়ে পড়ি যেখানে আমাদের পূর্বতন-পুরথ অন্যব্রতরা তাঁদের ঘরের মধ্যে রয়েছেন দেখি।

এই নিজেদের ঘরের মধ্যে থাকার অর্থ নিজস্বতায় স্থির থাকা। উপরে হিন্দু অনুষ্ঠানের গঙ্গামুক্তিকা, তারপর বৈদিক আমলের মূল্যবান ধাতুপ্তের, তারও তলায় অন্যব্রতদের এই সব ব্রত- একেবারে মাটির বুকের মধ্যেকার গোপন ভাণ্ডারে। এইভাবে আর্য-পূর্ব 'অন্যরতদের পালিত পূজা বা ব্রত পার্বণ থেকেই মেয়েলি ব্রতের উদ্ভব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ