ছোটদের বাংলা হাসির মজার ছড়া কবিতা | ছড়া কি, ছড়ার বৈশিষ্ট্য ও শ্রেনীবিভাগ

ছড়া কি বা কাকে বলে :-

লোক সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা 'ছড়া'। 'ছড়া’ শব্দটি দেশজ। যোগেশ চন্দ্র রায় তাঁর বাঙ্গলা শব্দকোষে (২য় খন্ড) এ বলেছেন সংস্কৃত ‘ছটা’ শব্দ থেকে ‘ছড়া’ শব্দটি এসেছে। ছড়া শব্দটি অর্থ 'শ্লোক' পরম্পরা।

হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় ছড়াকে "গ্রামকবিতা" বলেছেন, তার বঙ্গীয় শব্দকোষ গ্রন্থে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর “বাংলা ভাষার অভিধান" (২য় সং) এ ছড়াকে "ছন্দোবদ্ধ পদ পরম্পরা" বলেছেন।

পূর্ব ও পশ্চিমের বঙ্গের অধিবাসীরা ছড়াকে শ্লোক বলে থাকেন। ছড়ার এক একটি অংশ শৃঙ্খল বা শ্লোকে মতো গ্রথিত থাকে। মধ্যযুগীয় সাধারণ জন জীবনে ছড়া নারী ও পুরুষ সমাজে সমভাবে প্রচলিত ছিল। সেই কারণে ছড়াকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে -

“গানের মাধ্যমে ছড়ানো এবং পরপর গ্রন্থিত হল ছড়া।”

লোক সাহিত্যের আদিম কাল থেকে এই শাখাটির বিকাশ। ছড়া দেশ কাল অতিক্রম করে বিভিন্ন ভাবে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকে। ছড়ায় যে জীবন চিত্র ধরা পড়ে তা বাস্তব সম্মত ও সমাজ সম্মত ভাবে ফুটে ওঠে। সেই সঙ্গে লোক সাহিত্যের এই শাখাকে সমৃদ্ধ করে।
ছোটদের বাংলা হাসির মজার ছড়া কবিতা |  ছড়া কি, ছড়ার বৈশিষ্ট্য ও শ্রেনীবিভাগ

বাংলা ছড়ার বৈশিষ্ট্য :-

ছড়ার বৈশিষ্ট্য গুলোকে নীচে আলোচনা করা হলো-

১ - ছড়ায় যুক্তিসংগত ভাবের পারম্পর্য থাকে না।
২ - ছড়ায় ঘটনা বা কাহিনীর ধারাবাহিকতা থাকে না।
৩ - ছড়া মূলত ধ্বনিপ্রধান ও সুরাশ্রয়ী।
৪ - ছড়ায় রস ও চিত্র বর্মা, তবে উপদেশ নেই বললেই চলে।
৫ - ছড়ায় ছন্দ মূলত শ্বাসাঘাত।
৬ - ছড়া বাহুল্য বর্জিতও সংক্ষিপ্ত
৭ - ছড়ায় ভাষা সাধারণত হাল্কা চালের লঘু ও চপল।
৮ - ছড়ার রস স্নিগ্ধ ও সরস।


বাংলা ছড়ার শ্রেনীবিভাগ :-

অধ্যাপক নির্মলেন্দু ভৌমিক তাঁর "বাংলা ছড়ার ভূমিকা" গ্রন্থে বাংলা ছড়াকে মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

১ - আনুষ্ঠানিক ছড়া
২ - অনানুষ্ঠানিক ছড়া।

লোক সাহিত্যের গবেষক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর "বাংলার লোক সাহিত্য" ২য় খন্ড গ্রন্থে ছড়াকে ছয়টি শ্রেনীতে ভাগ করেছেন।

১ - শিশু বিষয়ক
২ - নারী বিষয়ক
৩ - পশুপক্ষী বিষয়ক
৪ - প্রকৃতি বিষয়ক
৫ - সমসাময়িক ঘটনা নির্ভর
৬ - উপকথার ছড়া।

আবার ছড়ার সৃষ্টির নিরিখে ছড়াকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১ - লৌকিক ছড়া
২ - সাহিত্যিক ছড়া
 

ছোটদের বাংলা হাসির মজার ছড়া ও কবিতা :-


"করেছি পন, নেব না পন

বৌ যদি হয় সুন্দরী

কিন্তু আমায় বলতে হবে

স্বর্নদেবে কয় ভরি।”

----------- অন্নদাশঙ্কর

আরও পড়ুন :- মহাকাব্য কি? এর বৈশিষ্ট্য?

"খুড়ো হে খুড়ো গর্ত খুঁড়ো

সঙ্গে ঢুকে গল্প জুড়ো

হঠাৎ হাঁচির কামান ছুঁড়ো।

খুড়ো গো খুড়ো হামাগুড়ি

খাটের তোলায় লেপের মুড়ি।

সঙ্গে রেখে টাকা কুড়ি

নইলে কখন যাবেচুরি।"

“নাচতে নাচতে খুলে যায় কারো কেশ

কারো খসে পড়ে বেশ।

নগ্নতনুর সীমাহীন শিখা

হয়না তো নিঃশেষ।"

--------আচার্য শঙ্করন

"শ্রীমতি অনামিকা দে

কেমন মধুর নাচে সে

সবকটি ভালো ভালো মে

সকলে হয়ে গেছে বে"

'প্রশ্ন' ছোটদের বাংলা ছড়া কবিতা :-

মা গো, আমায় ছুটি দিতে বল্‌,

সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা।

এখন আমি তোমার ঘরে ব'সে

করব শুধু পড়া-পড়া খেলা।

তুমি বলছ দুপুর এখন সবে,

নাহয় যেন সত্যি হল তাই,

একদিনও কি দুপুরবেলা হলে

বিকেল হল মনে করতে নাই?

আমি তো বেশ ভাবতে পারি মনে

সুয্যি ডুবে গেছে মাঠের শেষে,

বাগ্‌দি-বুড়ি চুবড়ি ভরে নিয়ে

শাক তুলেছে পুকুর-ধারে এসে।

আঁধার হল মাদার-গাছের তলা,

কালি হয়ে এল দিঘির জল,

হাটের থেকে সবাই এল ফিরে,

মাঠের থেকে এল চাষির দল।

মনে কর্‌-না উঠল সাঁঝের তারা,

মনে কর্‌-না সন্ধে হল যেন।

রাতের বেলা দুপুর যদি হয়

দুপুর বেলা রাত হবে না কেন

------------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আরও পড়ুন :- বিখ্যাত কিছু উপন্যাস সমূহ ?


পূজার সাজ বাংলা ছড়া :-

আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি,

পূজার সময় এল কাছে।

মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই,

আনন্দে দু-হাত তুলি নাচে।

পিতা বসি ছিল দ্বারে, দুজনে শুধালো তারে,

"কী পোশাক আনিয়াছ কিনে।'

পিতা কহে, "আছে আছে তোদের মায়ের কাছে,

দেখিতে পাইবি ঠিক দিনে।'

সবুর সহে না আর -- জননীরে বার বার

কহে, "মা গো, ধরি তোর পায়ে,

বাবা আমাদের তরে কী কিনে এনেছে ঘরে

একবার দে না মা, দেখায়ে।'

ব্যস্ত দেখি হাসিয়া মা দুখানি ছিটের জামা

দেখাইল করিয়া আদর।

মধু কহে, "আর নেই?' মা কহিল, "আছে এই

একজোড়া ধুতি ও চাদর।'

রাগিয়া আগুন ছেলে, কাপড় ধুলায় ফেলে

কাঁদিয়া কহিল, "চাহি না মা,

রায়বাবুদের গুপি পেয়েছে জরির টুপি,

ফুলকাটা সাটিনের জামা।'

মা কহিল, "মধু, ছি ছি, কেন কাঁদ মিছামিছি,

গরিব যে তোমাদের বাপ।

এবার হয় নি ধান, কত গেছে লোকসান,

পেয়েছেন কত দুঃখতাপ।

তবু দেখো বহু ক্লেশে তোমাদের ভালোবেসে

সাধ্যমত এনেছেন কিনে।

সে জিনিস অনাদরে ফেলিলি ধূলির 'পরে--

এই শিক্ষা হল এতদিনে।'

বিধু বলে, "এ কাপড় পছন্দ হয়েছে মোর,

এই জামা পরাস আমারে।'

মধু শুনে আরো রেগে ঘর ছেড়ে দ্রুতবেগে

গেল রায়বাবুদের দ্বারে।

সেথা মেলা লোক জড়ো, রায়বাবু ব্যস্ত বড়ো;

দালান সাজাতে গেছে রাত।

মধু যবে এক কোণে দাঁড়াইল ম্লান মনে

চোখে তাঁর পড়িল হঠাৎ।

কাছে ডাকি স্নেহভরে কহেন করুণ স্বরে

তারে দুই বাহুতে বাঁধিয়া,

"কী রে মধু, হয়েছে কী। তোরে যে শুক্‌নো দেখি।'

শুনি মধু উঠিল কাঁদিয়া,

কহিল, "আমার তরে বাবা আনিয়াছে ঘরে

শুধু এক ছিটের কাপড়।'

শুনি রায়মহাশয় হাসিয়া মধুরে কয়,

"সেজন্য ভাবনা কিবা তোর।'

ছেলেরে ডাকিয়া চুপি কহিলেন, "ওরে গুপি,

তোর জামা দে তুই মধুকে।'

গুপির সে জামা পেয়ে মধু ঘরে যায় ধেয়ে

হাসি আর নাহি ধরে মুখে।

বুক ফুলাইয়া চলে -- সবারে ডাকিয়া বলে,

"দেখো কাকা! দেখো চেয়ে মামা!

ওই আমাদের বিধু ছিট পরিয়াছে শুধু,

মোর গায়ে সাটিনের জামা।'

মা শুনি কহেন আসি লাজে অশ্রুজলে ভাসি

কপালে করিয়া করাঘাত,

"হই দুঃখী হই দীন কাহারো রাখি না ঋণ,

কারো কাছে পাতি নাই হাত।

তুমি আমাদেরই ছেলে ভিক্ষা লয়ে অবহেলে

অহংকার কর ধেয়ে ধেয়ে!

ছেঁড়া ধুতি আপনার ঢের বেশি দাম তার

ভিক্ষা-করা সাটিনের চেয়ে।

আয় বিধু, আয় বুকে, চুমো খাই চাঁদমুখে,

তোর সাজ সব চেয়ে ভালো।

দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে

ছিটের জামাটি করে আলো।'

-----------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জ্যোতিষ-শাস্ত্র ছড়া কবিতা :-

আমি শুধু বলেছিলেম --

"কদম গাছের ডালে

পূর্ণিমা-চাঁদ আটকা পড়ে

যখন সন্ধেকালে

তখন কি কেউ তারে

ধরে আনতে পারে।'

শুনে দাদা হেসে কেন

বললে আমায়, "খোকা,

তোর মতো আর দেখি নাইকো বোকা।

চাঁদ যে থাকে অনেক দূরে

কেমন করে ছুঁই;

আমি বলি, "দাদা, তুমি

জান না কিচ্ছুই।

মা আমাদের হাসে যখন

ওই জানলার ফাঁকে

তখন তুমি বলবে কি, মা

অনেক দূরে থাকে।'

তবু দাদা বলে আমায়, "খোকা,

তোর মতো আর দেখি নাই তো বোকা।'

দাদা বলে, "পাবি কোথায়

অত বড়ো ফাঁদ।'

আমি বলি, "কেন দাদা,

ওই তো ছোটো চাঁদ,

দুটি মুঠোয় ওরে

আনতে পারি ধরে।'

শুনে দাদা হেসে কেন

বললে আমায়, "খোকা,

তোর মতো আর দেখি নাই তো বোকা।

চাঁদ যদি এই কাছে আসত

দেখতে কত বড়ো।'

আমি বলি, "কী তুমি ছাই

ইস্কুলে যে পড়।

মা আমাদের চুমো খেতে

মাথা করে নিচু,

তখন কি আর মুখটি দেখায়

মস্ত বড়ো কিছু।'

তবু দাদা বলে আমায়, "খোকা,

তোর মতো আর দেখি নাই তো বোকা।'

------------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


মাস্টার বাবু মজার ছড়া কবিতা :-

আমি আজ কানাই মাস্টার,

পোড়ো মোর বেড়াল ছানাটি।

আমি ওকে মারি নে মা বেত,

মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।

রোজ রোজ দেরি করে আসে,

পড়াতে দেয় না ও তো মন,

ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই

যত আমি বলি, 'শোন্, শোন্'।

দিনরাত খেলা খেলা খেলা,

লেখা পড়ায় ভারি অবহেলা।

আমি বলি 'চ ছ জ ঝ ঞ',

ও কেবল বলে 'মিয়োঁ' মিয়োঁ'।

প্রথম ভাগের পাতা খুলে

আমি ওরে বোঝাই মা, কত-

চুরি করে খাস্ নে কখনো,

ভালো হোস্ গোপালের মতো।

যত বলি সব হয় মিছে,

কথা যদি একটিও শোনে-

মাছ যদি দেখেছে কোথাও

কিছুই থাকে না আর মনে।

চড়াই পাখির দেখা পেলে

ছুটে যায় সব পড়া ফেলে।

যত বলি 'চ ছ জ ঝ ঞ'

দুষ্টুমি করে বলে 'মিয়োঁ'।

আমি ওরে বলি বার বার

'পড়ার সময় তুমি পোড়ো,-

তার পরে ছুটি হয়ে গেলে

খেলার সময় খেলা কোরো'।

ভালোমানুষের মতো থাকে,

আড়ে আড়ে চায় মুখপানে,

এমনি সে ভান করে যেন

যা বলি বুঝেছে তার মানে।

একটু সুযোগ বোঝে যেই

কোথা যায় আর দেখা নেই।

আমি বলি 'চ ছ জ ঝ ঞ',

ও কেবল বলে 'মিয়োঁ মিয়োঁ।

------------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রশ্ন ছড়া কবিতা :-

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে

দয়াহীন সংসারে,

তারা বলে গেল "ক্ষমা করো সবে', বলে গেল "ভালোবাসো--

অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো'।

বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে

আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।

আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে

হেনেছে নিঃসহায়ে,

আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,

অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,

তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে--

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।

------------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ