একজন আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি কি? নেতার কার্যাবলী

একজন নেতার গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য :-

স্থান, কাল, পাত্র ভেদে নেতৃত্বের গুণাবলি ও ধরন বদলায়। কোন কোন গুণের অধিকারী হলে একজন ব্যক্তিকে আদর্শ নেতা বলা হবে তা বলা কঠিন। তবে এমন কিছু গুণ রয়েছে যেগুলো অর্জন করতে পারলে একজন নেতা উত্তম বা আদর্শ নেতায় পরিণত হতে পারেন। এ গুণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. মোহনীয় ব্যক্তিত্ব (Pleasing personality) :-

একজন নেতাকে অবশ্যই মোহনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হয়। ব্যক্তিত্বই একজন নেতার প্রধানতম গুণ। ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে নেতা অন্যের ইচ্ছা শক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়।

২. শক্তি ও সামর্থ্য (Power and ability) :-

একজন নেতার পর্যাপ্ত শারীরিক ও মানসিক শক্তি থাকা প্রয়োজন, যা তাঁকে উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়তা করে।

৩. জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা (Sufficient knowledge and experience) :-

একজন নেতাকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করার জন্য তাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে হয়।

৪. সহযোগিতামূলক মনোভাব (Cooperative attitude) :-

একজন নেতাকে অধস্তনদের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। সুতরাং সহযোগিতামূলক মনোভাব নেতাকে কার্য সম্পাদনে সহায়তা করে।
আদর্শ নেতার গুণাবলি

৫. শিক্ষাগত যোগ্যতা (Educational qualification) :-

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেতাকে নেতৃত্বে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। এ কারণে তাকে অন্তত সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয়।

৬. ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা (Ability of taking risk) :-

প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজন নেতাকে দায়দায়িত্ব নিয়ে ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। তাই নেতাকে ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা আয়ত্ব করতে হবে।

৭. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Taking quick decision) :-

প্রতিষ্ঠানে বিভিন্নমুখী প্রয়োজনে নেতাকে বিকল্প কর্মপন্থা উদ্ভাবনসহ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকা একান্ত অপরিহার্য।

৮. সাংগঠনিক দক্ষতা (Organisational efficiency) :-

কর্মীদের সুসংগঠিত করে তাদেরকে লক্ষ্য অর্জনের পথে ধাবিত করার জন্য একজন নেতাকে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জন করতে হয়।


৯. সততা ও ন্যায়পরায়ণতা (Honesty and justice) :-

নেতাকে সব সময়ই তার অনুসারীরা অনুকরণ করে থাকে। সে জন্য নেতাকে হতে হয় সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। নেতাকে অধিনস্তদের প্রতি নায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

১০. আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (Ability of controlling emotion) :-

আবেগ ব্যক্তিত্বকে হালকা করে ফেলে। একজন নেতাকে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

১১. যোগাযোগে দক্ষতা (Communication skill) :-

যোগাযোগ দক্ষতা নেতার একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। নেতৃত্বে সফলতার জন্য নেতাকে তাঁর অনুসারীদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।

১২. দূরদর্শিতা (Prudence) :-

পূর্বানুমান সঠিক হলে সুফল পাওয়া যায়। তাই একজন নেতাকে দূরদর্শী হতে হবে।

১৩. বুদ্ধিমত্তা (Intelligence) :-

নেতাকে সর্বদাই নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জকে তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবেলা করতে হলে তাঁকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হয়।

১৪. সংশ্লিষ্ট কাজে পারদর্শিতা (Expertise in concerned work) :-

একজন নেতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী না হলে প্রাসঙ্গিক সমস্যা সমাধান ও কর্মীদের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জ্ঞান ও ধারণা প্রদান করা তার দ্বারা সম্ভব হয় না।

১৫. প্রখর স্মৃতিশক্তি (Strong memory) :-

উত্তম নেতৃত্ব প্রদান ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য তাঁকে অত্যন্ত প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হতে হয়।

১৬. ধৈর্য্য (Patience) :-

বিরূপ পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে ফেললে লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে বিচ্যুত হবার সম্ভাবনা থাকে। একারণে আদর্শ নেতাকে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও স্থির চিত্তের অধিকারী হতে হয়।

আরও পড়ুন:- নিয়ন্ত্রণ কাকে বলে?

নেতার কার্যাবলী :-

প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের সঠিক পথে চালিত করাই নেতার মূল কাজ। তবে এ কাজ করার জন্য নেতাকে প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রাখতে হয়। যার ফলে নেতাকে সর্বদা 'চেক এন্ড ব্যালেন্স' করে চলতে হয়।

১. লক্ষ্যস্থির করা (fixing goals) :-

নেতাকে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যের সাথে মিল রেখে তাঁর নিজের কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। এর ভিত্তিতে তিনি পরবর্তীতে কর্মপন্থা এবং নীতিমালা প্রস্তুত করেন।

২. সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুতকরণ (preparing organizational structure) :-

লক্ষ্য অর্জনের জন্য নেতাকে দায়-দায়িত্ব বণ্টন, জবাবদিহিতা নিরূপ, বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন ইত্যাদি কার্য সম্পাদনের জন্য একটি সংগঠন কাঠামো তৈরি করতে হয়। সফলতা অর্জনের জন্য উত্তম সংগঠন কাঠামো প্রয়োজন।

৩. কর্মী নির্বাচন (employee selection) :-

নেতার একটি বিশেষ কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো এবং ভবিষ্যত নেতা তৈরি করা। অধীনস্ত্রগণ নেতার কাছ থেকে নেতৃত্বের গুণাবলী আত্মস্থ করবে এটাই স্বাভাবিক। সে জন্য নেতাকে অবশ্যই যোগ্য কর্মী নির্বাচন করতে হবে যাতে কার্য সম্পাদনে অসুবিধা না হয়।

8. নির্দেশনা প্রদান (direction) :-

প্রতিষ্ঠানের মানবীয় ও অমানবীয় সম্পদ যতই থাকুক না কেন, নির্দেশনার অভাব হলে তার যথাযথ ব্যবহার হবে না। সে কারণে নির্দেশনা দান করা নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

৫. কার্যকর তদারকি (effective supervision) :-

অধীনস্তদের যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে কাজে লাগানো এবং সে কাজের কার্যকর তদারকি করার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা নেতার অন্যতম কাজ।

৬. কার্যকর সমন্বয়সাধন ( effective coordination) :-

প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগ, উপ-বিভাগ, শাখা এবং বিভিন্ন কর্মীর মধ্যে সমন্বয় করার কাজটি নেতাকেই করতে হয়। সমন্বয়ের কাজটি সুষ্ঠু না হলে তিনি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবেন।


৭. ঐক্য সংরক্ষণ (safeguarding unity) :-

স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কারণে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মধ্যে ঐক্যে ফাটল ধরে। এতে দলীয় সংকীর্ণতা দেখা দিতে পারে। কর্মী ও বিভাগসমূহের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা তাই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

৮. কর্মীর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করা (influencing behaviour) :-

নেতা প্রতিনিয়ত অনুসারীদের ভালো-মন্দ খোঁজ-খবর নিবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি তাদের দুর্দশা লাঘবে প্রচেষ্টা চালাবেন। এ ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে নেতা কর্মীর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করেন।

৯. প্রতিনিধিত্ব করা (representing) :-

নেতাকে অবশ্যই তাঁর প্রতিষ্ঠান/অনুসারীদের জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। প্রতিনিধিত্বমূলক কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে তিনি বাইরের জগতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন।

১০. যোগাযোগ (communication) :-

নেতাকে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভাগ, উপবিভাগ, শাখা ও কর্মীদের সাথে সর্বদা যোগাযোগ করতে হয়। তিনি কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়ে থাকেন।

১১. অনুপ্রেরণা (Inspiring) :-

নেতা অনুসারীদের নানা অভাব পূরণ, সান্তনাসূচক বক্তব্য এবং স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকেন।

১২. পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো (Adapting with Changes) :-

বিশ্ব পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে কাজের ধরন পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতাকে পরিবর্তিত প্রযুক্তি গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। একজন আদর্শ নেতা সর্বদা এ ধরনের প্রযুক্তি গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানের কর্মসম্পাদন উন্নত করেন।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কাপ্তান যেমনিভাবে জাহাজ নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়, তেমনিভাবে নেতা তার অনুসারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথে চালিত করেন এবং সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ