গীতিকা বা ব্যালাড কাকে বলে? গীতিকার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

গীতিকাগুলি পূর্ববঙ্গে সুপ্রচলিত ছিল। গীতিকাগুলি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ১৮৭৮ স্যার জর্জ গ্রীয়ারসনের এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ‘মানিকচন্দ্র রাজার গান' প্রকাশিত হওয়ায় বাংলার শিক্ষিত মহলে গীতিকার প্রতি মনোযোগ দেয়। দীনেশচন্দ্র সেন, চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার পূর্ববঙ্গ থেকে গীতিকার রচনা উদ্ধার করেন। ফলস্বরূপ মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার দ্বার উন্মোচিত হয়।

আরও পড়ুন :- একাঙ্ক নাটক কাকে বলে?

ইংরাজী Ballad কথাটির বহুপ্রচলিত বাংলা অর্থ গীতিকা। প্রাচীন লাতিন Ballare শব্দ থেকে ইংরাজী Ballad শব্দটির আগমন ঘটেছে। লাতিন Ballare শব্দটির অর্থ নৃত্য। সুতারাং একথা অনস্বীকার্য যে উৎপত্তির সময় থেকেই Ballad এর সঙ্গে নিশ্চয়ই নৃত্যের একটা সংযোগ ছিল।

গীতিকার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য :-

লৌকিক কাব্যরূপে পরিচিত গীতিকাগুলি একাধারে কবিতা এবং লোকগীতি। প্রকরণের দিক থেকেও গীতিকাগুলি গীতিকবিতার স্বভাবপুষ্ট।

অন্যদিকে গীতিকা লোকমুখে প্রচলিত কাহিনীমূলক সংগীত। কাহিনীর উপস্থিতি যেমন গীতিকায় লক্ষণীয়, তেমনি সঙ্গীতের সুরহিল্লোল ও গীতিকায় সহজলভ্য। কাহিনীর এই সাংগীতিক বয়নের কারণেই পাশ্চাত্যের ‘ব্যালাড' এর সঙ্গে বাংলা গীতিকার অন্তর্মিল লক্ষ্য করা যায়।
গীতিকা বা ব্যালাড কাকে বলে

'ব্যালাড' সংক্রান্ত সংজ্ঞায় ড. সুর হেলেন চাইল্ড বিটরেজ গ্লিস ব্যালাডের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গীতিকার প্রযোজ্য। যেমন—

সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে বর্ণিত গল্পই গীতিকা

'A Ballad is a song that tells a story or to take other point of view-a story told in song'

গীতিকা একটি সরল, ছোট ছোট স্তবক নির্মিত, জনপ্রিয় কাহিনীর লৈখিক চিত্রের আকারে সংরচনা। [A simple spirited poem in short stanzas in which some popular story is graphically fold].

নাটকীয়ভাবে প্রকাশিত একক ঘটনাকেন্দ্রিক কাহিনীকে গীতিকা বলা যেতে পারে। [It deals with a ringle situation revealed dramatically]

গীতিকাগুলি সরল ছন্দ এবং সাধারণ সুরে বর্ণিত কাহিনী। [The traditional Ballad is a song that tells a story in simple verse and to a simple tune.]

আরও পড়ুন :- কবিতা কি বা কাকে বলে?

গীতিকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাহিনীকথক অনুপস্থিত থাকেন। মধ্যযুগে রচিত হলেও গীতিকায় ঈশ্বরের প্রসঙ্গ প্রায় অনুল্লেখ্য (বন্দনা অংশ ব্যতীত)। গীতিকার চরিত্ররা প্রায় সকলেই ভূমিপুত্র কন্যা। এই দেশ চরিত্রের সমবায়ে রচিত গীতিকাগুলি মৌখিক ঐতিহ্যানুসারী। গীত হওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত গীতিকাগুলি মৌখিক ঐতিহ্যানুসারী। গীত হওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত গীতিকাগুলির বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ।

সংক্ষিপ্ততা ও তীক্ষ্ণ গতিময়তাই, গীতিকার প্রধানগুণ। গীতিকার বাহিনী শিথিল বন্ধ হলে চলবেনা, হতে হবে দুঢ়পিনবদ্ধ।


গীতিকায় থাকবে একধরনের শিশুসুলভ সারল্য। জীবনের সহজ-সরল মৌলিক বৃত্তিগুলি সেখানে প্রায় নির্বিচারে স্থান পায়। গীতিকা যেহেতু গ্রাম্য অল্পশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত বা নিরক্ষর জনমানসের সৃষ্টি তাই এর প্রকাশ রীতি খুব সহজ ও সরল।

নৈর্ব্যক্তিকতা গীতিকার প্রাণ। যেকোনো গীতিকাই একটি বিশেষ জাতির আশা-আকাঙ্খার কথা প্রকাশ করে। ব্যক্তিগত মানসিকতা সেখানে তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মসচেতন গীতিকা রচয়িতা নৈর্ব্যক্তিকভাবে কাহিনীকে উপস্থাপন করেন।

একক কাহিনী নির্ভর ঘটনা গীতিকার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কাহিনীর একমুখী ঘটনা শ্রোতার মনে পরম বিস্ময় সৃষ্টি করে দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাকে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

গীতিকার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তা গীত হবার যোগ্য। গীতিকাগুলো মূলতঃ লোকসঙ্গীত, যা নির্দিষ্ট সুরে গীত হবার সময়, বেহালা, সারিন্দা, দোতারা, ঢাক, ঢোল, সানাই ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হত।

কোনো কোনো অংশের পুনরুক্তি গীতিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইংরাজীতে একে বলে Refrain বাংলায় ধুয়া বা ধ্রুপনাকে এর অনুবাদ হিসাবে ধরা যায়। তবে ধুয়া ছাড়াও কতকগুলি বাঁধা ধরা শব্দ বা শব্দসমষ্টি গীতিকায় বারবার ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ছদ ও অলংকার ব্যবহার গীতিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই বাকা বা একই অর্থবাচক শব্দ পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত হয়ে যেমন অলংকারের দৃষ্টি করে, তেমনি ধ্বনিতরঙ্গ সৃষ্টি করে ছন্দের দ্বারা শ্রুতিকে তৃপ্ত করে। তবে ছন্দের ক্ষেত্রে মাত্রার অভাবজনিত ক্ষতি উচ্চারণ দিয়ে পূর্ণ করা হয়।

গীতিকার শ্রেনীবিভাগ :-

বাংলাদেশে প্রাপ্ত গীতিকাগুলি তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যথা -
  1. নাথ গীতিকা,
  2. ময়মনসিংহ গীতিকা এবং
  3. পূর্ববঙ্গ গীতিকা।

ধর্মীয় ও আঞ্চলিকতার বিচারে গীতিকাগুলিকে তিনটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। যথা
  1. নাথগীতিকা
  2. ময়মনসিংহ গীতিকা এবং
  3. পূর্ববঙ্গগীতিকা।


ডঃ বহ্নিকুমার ভট্টাচার্যের মতে বাংলা গীতিকাগুলি পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত। আবার অধ্যাপক বরুণ চক্রবর্তী তাঁর ‘গীতিকাস্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য’ গ্রন্থে গীতিকাগুলিকে তেরোটি পর্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন।

  • অলৌকিক কাহিনীকেন্দ্রিক গীতিকা
  • ধর্মীয় গীতিকা
  • রোমান্টিক বিয়োগান্তক
  • প্রেমকেন্দ্রিক গীতিকা
  • রাখালী গীতিকা
  • গৃহবিবাদ সংক্রান্ত গীতিকা
  • ঐতিহাসিক গীতিকা
  • অর্ধ ঐতিহাসিক গীতিকা
  • অপমৃত্যু ও বিপদ বিষয়ক গীতিকা
  • চর্যা
  • আঞ্চলিক গীতিকা
  • লোক নায়ক
  • ধাঁধাকেন্দ্রিক গীতিকা
  • হাসির কাহিনী

নাথগীতিকা :-

নাথ-সম্প্রদায়কেন্দ্রিক গীতিকার দুটি প্রধান ভাগ আছে একটি নাথগুরুদের অলৌকিক সাধন-ভজনের কাহিনী আর একটি তরুণ রাজপুত্র গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাসের কাহিনী।


প্রথম ভাগটিকে কেন্দ্র করে এপর্যন্ত যে সকল গীতিকা প্রকাশিত হয়েছে, তা 'গোরক্ষ-বিজয়', 'মীনচেতন' নামে পরিচিত।

আর দ্বিতীয় বিষয়টি সম্পর্কে যে সকল গীতিকা প্রকাশিত হয়েছে, তা ‘মানিকচন্দ্র রাজার গান', 'গোবিন্দ চন্দ্রের গীত', 'ময়নামতীর গান', 'গোবিন্দ চন্দ্রের গান’, ‘গোপীচাদের সন্ন্যাস', 'গোপীচাঁদের পাঁচালী' ইত্যাদি নামে পরিচিত।

নাথগীতিকাগুলো প্রধানত উত্তরবঙ্গেই প্রচার লাভ করেছিল, সেখানে এটি যুগীযাত্রা নামে পরিচিত। রংপুর জেলার মুসলমান কৃষকদের মুখে এই গান শুনে স্যার জর্জ গ্রীয়ারসন তা লিখে নেন এবং 'মানিকচন্দ্র রাজার গান' এই নাম দিয়ে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় তা সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন।

মৈমনসিংহ গীতিকা :-

মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার বিষয় বস্তু মূলত প্রেম, আর তার অবলম্বন মানুষ। বাংলা সাহিত্যের লিখিত ধারা-মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবকাব্য, অনুবাদ কাব্য প্রভৃতি যখন ধর্মকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছিল, দেবতা পূজার ভিড়ে মানুষের কাহিনী নিয়ে আবির্ভূত হল মৈমনসিংহ গীতিকা। লোকসমাজে প্রচলিত এই গীতিকাগুলো বাংলা সাহিত্যে নিয়ে এলো একটা নতুন ধারা, সে ধারা মানবিক ধারা।

মৈমনসিংহ গীতিকাগুলো এ জেলার কৃষক সম্প্রদায়ের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। দীনেশচন্দ্র সেনের পরামর্শে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকুলো চন্দ্রকুমার দে'র সংগৃহীত এই গীতিকাগুলো দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ১৯২৩ খ্ৰীঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'মৈমনসিংহ গীতিকা' নামে প্রকাশিত হয়।

পূর্ববঙ্গ গীতিকা :-

বাংলা গীতিকার ত্রিধারার তৃতীয় ধারাটি হল পূর্ববঙ্গ গীতিকা। আপনারা পূর্বেই শুনেছেন যে, পূর্ববঙ্গ গীতিকার দুই তৃতীয়াংশ কবিতা মৈমনসিংহ জেলার অন্তর্ভুক্ত। মৈমনসিংহ গীতিকা ছাড়াও ত্রিপুরা, নোয়াখালি, মৈমনসিংহ, চট্টগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চল থেকে সংগৃহীত গীতিকাগুলো দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনাতেই স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সাহায্য-পুষ্ট হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' নামে প্রকাশিত হয়। মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকাগুলো আবার দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ইংরাজিতে অনূদিত হয়ে Eastern Bengali Ballads of Mymensingh নামে প্রকাশিত হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ