লোকনাট্য কি? লোকনাট্যের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য?

লোকজীবনের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে মুখে মুখে রচিত এবং অভিনীত নাটককে সাধারণত লোকনাট্য বলা হয়। লোকনাট্য অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক এবং বাকুকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধন। লোকনাট্য একইসঙ্গে দৃশ্য, শ্রব্য এবং অভিনেয়। ছড়ায় আছে কল্পনা, ধাঁধায় আছে রহস্যময়তা, প্রবাদে আছে বাস্তব অভিজ্ঞতা, লোকসংগীতে প্রকাশ পায় আবেগ-উচ্ছ্বাস আর লোকনাটো ধরা পড়ে সমাজজীবনের বাস্তব ছবি। কিন্তু লোকনাটোর এই বিশেষ রূপটি এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন :- লোকসংস্কৃতি কাকে বলে?

বর্তমান লোকনাটা ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, লোকনাট্যের উদ্ভবের পিছনে ধর্মের ভূমিকা ছিল বিদ্যমান। মূলত ধর্মীয় কোন ভাবনা থেকে লোকনাটোর উদ্ভব ঘটলেও, । ধীরে ধীরে বাতাবরণ মুক্তির দিকে এগিয়েছে এবং সম্পূর্ণ বাস্তব, সামাজিক পূর্ণতার দিকে তার যাত্রা ত্বরান্বিত হয়েছে। গ্রামবাংলায় ব্যাপক পরিমাণে প্রচলিত যাত্রা পালাকে অনেকে লোকনাট্য বলে অভিহিত করতে চান। যাত্রার মধ্যে লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কিন্তু, আধুনিক যাত্রার উপস্থাপনা ও অভিনয় রীতি যেদিকে এগিয়েছে, তার সঙ্গে লোকনাট্যের মঞ্চ, অভিনয় কাহিনীগত ব্যবধান খুব স্পষ্ট।

লোকনাট্য কি বা কাকে বলে :-

লোকজীবনের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে মুখে মুখে রচিত এবং অভিনীত নাটককে সাধারণত লোকনাট্য বলা হয়। 

Folk Drama is a representation of actions in specified human life. 

সংক্ষেপে বলা লোকসাধারণের জন্য লোকসাধারণ দ্বারা রচিত যে নাটক তাই লোকনাটক।

লোকসমাজে, লোকসমাজের জন্য এবং লোকসমাজের দ্বারা অভিনীত নাট্যই লোকনাট্য।
লোকনাট্য কি?

লোকনাট্যের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য :-

  • সংহত ও গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের মধ্য থেকে লোকনাটক জন্মলাভ করে।।
  • কাহিনীর মধ্যে আদি মধ্য অন্ত সংযোগ থাকে না। একধরনের কাহিনীগত শিথিলতা এর মধ্যে দেখা যায়।
  • বলিষ্ঠ লোকপ্রিয় আঙ্গিক ব্যবহৃত হয়।
  • এই নাটকের বিষয় ভাবনা অনেক সময়ই পরিকল্পনাহীন।
  • আঞ্চলিক উপভাষা এর প্রাণশক্তি।
  • তত্ত্ব বর্জিত এই নাটক অত্যন্ত সাবলীল।
  • রঙ্গমঞ্চের অকৃত্রিমতা।
  • অভিনেতা ও দর্শক-শ্রোতার মধ্যে স্থানগত ও রুচিগত ব্যবধান থাকেনা। বর্তমানের পথ নাটিকার সঙ্গে এর অনেক মিল দেখা যায়। 'কথান্তর'-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই কাহিনী নানা সময়ে নানা রূপ লাভ করে।
  • সঙ্গীত ও নৃত্য প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।  লোকনাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  • লোকনাটক অনেক সময়ই উদ্দেশ্যমূলক রচনা। 
আরও পড়ুন :- লোকসাহিত্য কি?
  • পরিবর্তনশীলতা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  • লোকনাটক গতিশীল ও বিবর্তনশীল।
  • অধিকাংশ লোকনাটকে পুরুষ চরিত্র সংখ্যায় বেশি থাকে।
  • কাহিনী পুরাণ ও লোকসমাজ নির্ভর। 
  • প্রশ্নমূলক তথা ধাঁধার ব্যবহার লোকনাটকের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
  • লোকনাটকের অনেকটা অংশই অভিনয়কালীন রচনা অর্থাৎ তাৎক্ষণিক রচনা। 
  • লোকনাট্যের চরিত্রগুলি সাধারণত একমাত্রিক। জটিল চরিত্র লোকনাটকে বিরল।
  • গদ্য ও পদ্য দুধরনের সংলাপ ব্যবহৃত হয়।

বিভিন্ন প্রকার লোকনাট্যের পরিচয় :-

খনের গান :-

উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলাতে এই শ্রেণীর লোকনাট্য অভিনীত হয়। 'খন' শব্দটি সংস্কৃত 'ক্ষণ' থেকে এসেছে; এ জাতীয় লোকনাট্য বা গান তাৎক্ষণিক রচিত বলে, এর নাম খন বা খনের গান।

সাধারণত নিরক্ষর গ্রাম্য পালা রচয়িতারা সারা বছর ধরে গ্রামের সামাজিক এবং পারিবারিক নানা ঘটনার উপর লক্ষ্য রাখে এবং যদি সে বছর কোন প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে গ্রামে কোনো কেলেঙ্কারী প্রকাশ পায়, যেমন কুলত্যাগ, অসবর্ণ বিয়ে, গোপন প্রণয় ইত্যাদি, তাহলে তারা সেই প্রসঙ্গগুলো ব্যবহার করে মুখে মুখে নাটক রচনা করে তার অভিনয় করে।

পালাটিয়া :-

উত্তরবঙ্গের আর এক শ্রেণীর গ্রামীণ লোকনাট্যের নাম পালাটিয়া। পালা শব্দের অর্থ লোকনাট্যের কাহিনী। এ শ্রেণীর লোকনাট্যের বিষয় বা কাহিনী খনের মতো তাৎক্ষণিক রচিত নয়, বরঞ্চ একটা গতানুগতিক।

জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলায় এ জাতীয় লোকনাট্যের প্রচলন। নাচ, গান ও ছড়া সংলাপের সমন্বয়ে 'পালাটিয়া' তৈরি। মূলত রূপকথার কাহিনী, কিংবদন্তীমূলক ও সামাজিক কাহিনী নিয়ে এ জাতীয় লোকনাট্য নির্মিত।

আঞ্চলিক সংলাপ এবং পল্লীগীতির সুরে এ পালার গান বাঁধা হয়। প্রধান গায়কের সঙ্গে সোহার ও বাদকগণ এ নাট্যে সহযোগিতা করে। এ শ্রেণীর লোকনাট্যে 'মহান' এবং 'দেউলিয়া' চরিত্র উপস্থাপিত হয়। নাচ, গান ও সংলাপযোগে পূর্ণ পালাই পালাটিয়াতে অভিনীত হয়। তাতে সাধারণত ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়, অন্যায়ের শাস্তি প্রভৃতি দেখানো হয়।


তবে পালাটিয়া যদি নীতিমূলক কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয়, তাকে ‘মান পালাটিয়া’ বলে, আর প্রেমমূলক কাহিনী নিয়ে রচিত হলে তাকে 'নাস পালাটিয়া' বলে।

লেটো :-

বীরভূম, বর্ধমান ও হাওড়া জেলায় প্রচলিত এক বিশেষ লোকনাটাকে বলে লেটো। লেটো মূলত নৃত্য, গীত ও হাস্যরসাত্মক সংলাপ ভিত্তিক লোকনাট্য। এখানে গ্রামজীবনের ছোট খাটো ঘটনা আঞ্চলিক সংলাপের মাধ্যমে নাট্যাকারে পরিবেশিত হয়।

রঙ পাঁচালী :-

উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং জেলার কোন কোন অংশে অভিনীত এক ধরনের লোকনাট্য রঙপাঁচালী। এ শ্রেণীর লোকনাট্যে সাধারণত জীবনের লঘু দিকটিকে তুলে ধরা হয়। তা আগাগোড়া হাস্যরসাত্মক। হাসারস দিয়ে যেমন এর সূচনা, তেমনি হাস্যরসেই এর সমাপ্তি। আর তার অন্তরালে বাস্তব জীবনভিত্তিক সুসংবদ্ধ একটি কাহিনী।

গম্ভীরা :-

মালদহ জেলার বিখ্যাত লোকনাট্য গম্ভীরা। গম্ভীরা মূলত শিব-মাহাত্ম্যমূলক গান। এ গানের সঙ্গে নৃত্যেরও সম্পর্ক আছে। সাধারণত লৌকিক সুর্যোৎসব বা শিবের গাজন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। শিবের গাজন বা সূর্যোৎসবকে এই অঞ্চলে গম্ভীরা বলে। চৈত্রমাসে শুরু হয়ে বৈশাখ মাসের প্রথম পর্যন্ত গম্ভীরা উৎসব চলে। অনুষ্ঠানটি প্রকৃতপক্ষে কৃষকদের সামাজীবনে সারা বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর একটি পর্যালোচনা।

আলকাপ :-

আলকাপের অপর নাম আলকাটা কাপ। আলকাপ শব্দটি সম্ভবত আরবি শব্দভাণ্ডার থেকে জাগত। এর অর্থ সামাজিক রঙ্গ ব্যঙ্গ। 'আল' বলতে তীক্ষ্ণ বা ধারালো বোঝায়, 'কাপ' বলতে বোঝায় কপটতা বা রঙ্গবাঙ্গ। অর্থাৎ যে রঙ্গরসিকতার মধ্যে দিয়ে কোন কিছুকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ বিদ্ধ করা হয় বা 'আল' কাটা হয় যে কাপের মধ্যে দিয়ে, তাকে আলকাপ বলে। মুর্শিদাবাদ, মালদা ও বীরভূম জেলাতে আলকাপের প্রচলন আছে। বীরভূম জেলাতে আলকাপ জাতীয় লোকনাট্য 'ছ্যাঁচড়া' নামে প্রচলিত।

আরও পড়ুন :- অনুধাবন করতে পারে কিভাবে?

যাত্রা :-

লোকনাট্যের একটি ধারা যাত্রা। যাত্রায়, বিশেষভাবে প্রাচীন যাত্রায়, লোকনাট্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান। যাত্রার দর্শক পরিবৃত সমতল আসর, যাত্রার অধিকারী, অভিনেত্রী ও তাদের অভিনয় পদ্ধতি, লোককর্মী বিষয়, গীতিভূমিকা ও যন্ত্রানুষঙ্গ ইত্যাদির ভিতর দিয়ে লোকসাহিত্যের সঙ্গে যাত্রার গোত্রসম্পর্ক অনুধাবন করা যায়। যাত্রার প্রকারভেদও এই সূত্রে আলোচ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ