সংগঠন কাকে বলে? সংগঠনের প্রকারভেদ ও পদক্ষেপ সমূহ?

সংগঠন শব্দটি বিভিন্ন অর্থ বহন করে থাকে। কখনো কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে বোঝাতে সংগঠন শব্দটি ব্যবহার করা হয়; যেমন- ব্যবসায় সংগঠন, সরকারি সংগঠন, সেবামূলক সংগঠন ইত্যাদি।

আবার কোনো কিছু গঠন করা অর্থেও সংগঠন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন- ক্লাব, সমিতি কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠান গঠন করা।

কিন্তু ব্যবস্থাপনায় সংগঠন শব্দটি ভিন্ন অর্থ বহন করে। এ ক্ষেত্রে সংগঠন বলতে প্রতিষ্ঠানের উপকরণাদি একত্রীকরণ, এতে নিয়োজিত কর্মীদের কার্যাবলি চিহ্নিতকরণ, তাদের প্রয়োজনীয় দায়দায়িত্ব বণ্টন ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কার্যাবলির সুষ্ঠু সমন্বয় সাধনকে বোঝানো হয়।

অর্থাৎ কোনো বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের কাজসমূহ চিহ্নিত করা, এগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা, কর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিরূপণ করা এবং তাদের কার্যাবলির সুষ্ঠু সমন্বয় সাধনই হচ্ছে সংগঠন।

সংগঠন শব্দের অর্থ :-

সংগঠন এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Organization। আর Organising শব্দটি "Organism" থেকে এসেছে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে কতগুলো পৃথক অংশকে এমনভাবে সমন্বিত করা যার কারণে প্রত্যেকটি অংশের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে কোন কিছুর সৃষ্টি হয়।
সংগঠন কাকে বলে

সংগঠন কাকে বলে :-

আইরিস ও কুঞ্জ (H. Weihrich and H. Koontz)-এর মতে, “সংগঠনের অর্থ হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কার্যাবলিকে বিভাগীয়করণ, প্রত্যেক বিভাগকে একজন ব্যবস্থাপকের অধীনে ন্যস্ত করা, তাকে বিভাগীয় কাজ তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা প্রদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সমান্তরাল ও খাড়াখাড়িভাবে সমন্বয় সাধনের ব্যবস্থা করা"।

লুইস এ এ্যালেন এর মতে, “ সম্পাদনযোগ্য কাজগুলো সনাক্তকরণ ও শ্রেণীবদ্ধকরণ, কর্মীদের দায়িত্ব এবং কর্তৃত্ব নির্ধারণ ও অর্পণ, এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের ফলপ্রসূভাবে কর্মসম্পাদনের নিমিত্তে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন প্রক্রিয়াকে সংগঠিতকরণ বা সংগঠন বলা হয়"।

আরও পড়ুন:- রপ্তানি কাকে বলে?

সংগঠনের প্রকারভেদ :-

সংগঠনকে প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা-
  • অনানুষ্ঠানিক সংগঠন (Informal organization)
  • আনুষ্ঠানিক সংগঠন (Formal organization)

প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি, আকার-আয়তন, কাজের ধরন ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকারের অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের উদ্ভব হয়েছে। যেমনঃ
  • বন্ধুসুলভ অনিয়ম তান্ত্রিক রাষ্ট্র,
  • কর্ম গোত্রভুক্ত অনিয়মতান্ত্রিক সংগঠন।

নিচে এদের ব্যাপারে আলোচনা করা হলোঃ

(১) বন্ধুত্ব সুলভ অনিয়মতান্ত্রিক সংগঠন :-

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মীর মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ফলে এসকল কর্মী একে অপরের সাথে সহযোগিতা ও যোগাযোগ করে এবং একে অপরের কার্যধারা প্রভাবিত হয়। তাই প্রতিষ্ঠানে যখন এরূপ দলের অস্তিত্ব থাকে তখন দেখা যায় একজন কর্মী তার বন্ধুকর্মীর কাজের সহযোগিতা করছে বা তার কাজে প্রভাব বিস্তার করছে।

(২) কর্ম-গোত্রভুক্ত অনিয়মতান্ত্রিক সংগঠন :-

অন্য এক প্রকার অনিয়মতান্ত্রিক সংগঠন দেখা যায় যেগুলো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে গড়ে ওঠে। সাধারণতঃ যে সব কর্মী খুব ঘনিষ্ঠভাবে একত্রে কার্য সম্পাদন করে, তাদের মধ্যে এরূপ সংগঠন গড়ে ওঠে।

প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি, আকার-আয়তন, কাজের ধরন ইত্যাদির ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক সংগঠনকেও কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।

১. সরলরৈখিক সংগঠন (Line organization)
২. সরলরৈখিক ও উপদেষ্টা সংগঠন (Line and Staff organization)
৩. কার্যভিত্তিক সংগঠন (Functional organization)
8. কমিটি (Committee)


১. সরল রৈখিক সংগঠন :-

যে সংগঠন ব্যবস্থায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ স্তর থেকে সরাসরি নিচের দিকে প্রবাহিত হয় তাকে সরলরৈখিক সংগঠন বলে।

এ ধরনের সংগঠনের অধীনস্তদের ওপর ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর সরাসরি কর্তৃত্ব থাকে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মীই জানে কার নিকট থেকে তিনি নির্দেশ পাবেন এবং কার কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

যে সব ব্যবস্থাপকের সরলরৈখিক কর্তৃত্ব থাকে তাদেরকে সরলরৈখিক কর্মকর্তা বা লাইন ম্যানেজার বলা হয়।

২. সরল রৈখিক ও উপদেষ্টা সংগঠন :-

যে সংগঠনে সরলরৈখিক কর্মকর্তার কার্যে সহযোগিতাদানের লক্ষ্যে সরলরৈখিক কর্মকর্তার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ কর্মী বা উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় তাকে সরলরৈখিক ও উপদেষ্টা সংগঠন বলে।

সরলরৈখিক ও উপদেষ্টা সংগঠনে দুধরনের কর্মকর্তা থাকেন। এক ধরনের কর্মকর্তা হচ্ছেন সরলরৈখিক কর্মকর্তা এবং অন্য ধরনের কর্মকর্তা হচ্ছেন উপদেষ্টা বা বিশেষজ্ঞ কর্মী।

উপদেষ্টাগণ সরলরৈখিক কর্মকর্তাকে পরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের আদেশ-নির্দেশ দানের কিংবা সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষমতা থাকে না। এ সংগঠনকে 'সরলরৈখিক ও পদস্থ সংগঠন' বা 'সরলরৈখিক ও স্টাফ সংগঠন' বলে।

৩. কার্যভিত্তিক সংগঠন :-

এ ধরনের সংগঠনে ব্যবস্থাপনার কার্যসমূহকে কাজের ধরন ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে প্রতিটি কাজের দায়িত্ব এক একজন নির্বাহীর অধীনে ন্যস্ত করা হয়।

অর্থাৎ এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের সরলরৈখিক কর্মকর্তা বা লাইন ম্যানেজারের কার্যাবলি তাদেরকে সম্পাদন করতে না দিয়ে আলাদা বিভাগ খোলা হয় এবং সে বিভাগের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বা ম্যানেজারের নিকট ঐ কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সাধারণত এমন ধরনের কাজগুলো আলাদা করা হয় যেগুলো লাইন ম্যানেজারের পক্ষে বিশেষায়িত জ্ঞানের অভাবে কিংবা অদক্ষতার কারণে সঠিকভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে যায়।

৪. কমিটি সংগঠন :-

এটি এমন ধরনের সংগঠন যেখানে বিশেষ কোন প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন করার জন্য সাধারণত এক বা একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা হয়। এটি বস্তুতপক্ষে একাধিক ব্যক্তির একটি গ্রুপ।

কোনো বিশেষ ধরনের প্রশাসনিক কাজ বা অন্য কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য কয়েকজন ব্যক্তির একটি দল গঠন করা হয়। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত সুপারিশসহ কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা কমিটি এ জাতীয় সংগঠনের উদাহরণ।

আরও পড়ুন:- রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় কাকে বলে?

সংগঠনের প্রক্রিয়া বা পদক্ষেপ সমূহ :-

প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি ও সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে সংগঠিত করার কাজটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়। ধাপে ধাপে গৃহীত পদক্ষেপগুলো সমষ্টিগতভাবে সংগঠন প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। সংগঠন প্রক্রিয়ার সাথে প্রধানত পাঁচটি পদক্ষেপ জড়িত। এ পদক্ষেপগুলো হচ্ছে-

১. কাজের শ্রেণিবিন্যাস (Classification of work) :-

প্রথমেই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রণীত পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে যেসব কাজ সম্পন্ন করতে হবে, সেগুলোকে সনাক্ত করা হয় এবং সাধারণত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।

২. কার্যাবলির বিভাগীয়করণ (Departmentation of works) :-

শ্রেণিবিন্যাসের পর কাজগুলোকে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এটি বিভাগীয়করণ নামে পরিচিত।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক স্তর নির্দিষ্টকরণ (Specifying organisational level) :-

বিভিন্ন কার্যাবলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাসকৃত কাজগুলোকে স্বতন্ত্র বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করার পর সাংগঠনিক চার্ট তৈরি করা হয়।

এ চার্টে কোন ব্যক্তি কার নিকট রিপোর্ট বা জবাবদিহি করবে তা সুনির্দিষ্ট করে দেখান হয়। বিভাগগুলোকে পরস্পরের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের ফলে কতিপয় প্রাতিষ্ঠানিক স্তর সৃষ্টি হয়।

৪. কর্তৃত্ব অর্পণ (Delegation of authority) :-

প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন বিভাগে ব্যবস্থাপকসহ সরলরৈখিক বা লাইন ব্যবস্থাপকদের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।

৫. সমন্বয়সাধন (Coordination) :-

বিভাগীয় কাজগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং পরীক্ষণ বা মনিটরিং সিস্টেম প্রবর্তন করা হয়। এ প্রক্রিয়া সমন্বয় সাধন নামে পরিচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ