চতুর্ভুজ কাকে বলে? চতুর্ভুজ কত প্রকার ও কি কি? চতুর্ভুজ এর বৈশিষ্ট্য?

চতুর্ভুজ হল একটি বন্ধ আকৃতি এবং এক ধরনের বহুভুজ যার চারটি বাহু, চারটি শীর্ষবিন্দু এবং চারটি কোণ রয়েছে। এটি গঠিত হয় চারটি নন-কোলিনিয়ার বিন্দুকে যুক্ত করে। চতুর্ভুজের অভ্যন্তরীণ কোণের সমষ্টি সর্বদা 360 ডিগ্রির সমান।

চতুর্ভুজ শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ' Quadra ' থেকে এসেছে যার অর্থ চার এবং ' Latus ' অর্থ 'পক্ষ'। চতুর্ভুজের চারটি বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হওয়া জরুরি নয়। তাই, বাহু এবং কোণের উপর ভিত্তি করে আমাদের বিভিন্ন ধরনের চতুর্ভুজ থাকতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা চতুর্ভুজের প্রকার, চতুর্ভুজের চতুর্ভুজ সূত্রের উদাহরণ, চতুর্ভুজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং আরও অনেক কিছু সম্পর্কে শিখব।

চতুর্ভুজ কাকে বলে :-

চতুর্ভুজ হল একটি বহুভুজ যার চারটি বাহু, চারটি কোণ এবং চারটি শীর্ষবিন্দু রয়েছে।

এককথায় চার বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রকে চতুর্ভুজ বলে।

একটি সমতলে অবস্থিত চারটি পৃথক বিন্দু ABC ও D মধ্যে যদি কোন তিনটি বিন্দু একটি সরলরেখাতে অবস্থিত না থাকে। এবং AB, BC. CD ও DA প্রান্ত বিন্দু ছাড়া অন্য কোন বিন্দু পরস্পরকে ছেদ করবে না। তবে AB. BC, CD, DA এর সংযোগকে একটি চতুর্ভূজ বলা যায়।

যদি সমতল A, B, C, D বিন্দু চারটি এমন হয় যে,

(ক) তাদের যেকোনো তিনটি সমরেখ নয়

(খ) AB, BC, CD, DA রেখাংশগুলোর কোনো দুইটির প্রান্ত বিন্দু ছাড়া সাধারণ বিন্দু নাই এবং

(গ) AB রেখার একই পার্শ্বে C ও D এবং CD রেখার একই পার্শ্বে A ও B অবস্থিত হয়, তবে AB, BC, CD, DA রেখাংশ চারটির সংযোগে উৎপন্ন চিত্রকে ABCD চতুর্ভুজ বলা হয়।

ABCD চতুর্ভুজকে অনেক সময় ABCD লিখে নির্দেশ করা হয়।
চতুর্ভুজ কাকে বলে

চতুর্ভুজের অংশ :-

  • ∠A, ∠B, ∠C এবং ∠D হল ABCD চতুর্ভুজের চারটি কোণ
  • AB, BC, CD, এবং DA হল ABCD চতুর্ভুজের চারটি বাহু।
  • AB ও CD এর একটিকে অপরটির এবং BC ও DA এর একটিকে অপরটির বিপরীত বাহু।
  • A, B, C, এবং D হল চতুর্ভুজ ABCD এর চারটি শীর্ষবিন্দু।
  • A ও C এর একটিকে অপরটির এবং B ও D এর একটিকে অপরটির বিপরীত শীর্ষবিন্দু।
  • AC এবং BD চতুর্ভুজ ABCD এর দুটি কর্ণ।

চতুর্ভুজের বাস্তব জীবনের উদাহরণ:

অনেক বাস্তব-জীবনের চতুর্ভুজ উদাহরণ রয়েছে: কার্ড, দাবা বোর্ড, ট্রাফিক চিহ্ন ইত্যাদি।
চতুর্ভুজের বাস্তব জীবনের উদাহরণ

চতুর্ভুজ কত প্রকার ও কি কি :-

চতুর্ভুজকে বাহু ও কোণের বিভিন্ন পরিমাপের ভিত্তিতে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
  1. সামান্তরিক (Parallelogram) (চিত্র-ক)
  2. আয়ত বা আয়তক্ষেত্র (Rectuagle) (চিত্র-খ)
  3. বর্গ বা বর্গক্ষেত্র (Square) (চিত্র-গ)
  4. রম্বস (Rhombus) (চিত্র-ঘ)
  5. ট্রাপিজিয়াম (Trapezium) (চিত্র-ঙ)
চতুর্ভুজ কত প্রকার

চতুর্ভুজকে ছেদকের ভিত্তিতে নিম্নরূপ দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
  1. সরল চতুর্ভুজ (Simple Quadrilateral)
  2. জটিল চতুর্ভুজ (Complex Quadrilateral)

সরল চতুর্ভুজ আবার দুই প্রকারঃ
  1. উত্তল (Convex Quadrilaterals)
  2. অবতল চতুর্ভুজ (Concave Quadrilaterals)

চতুর্ভুজের এই প্রকারভেদ সম্পর্কে নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে!

সামান্তরিক (Parallelogram):

যে চতুর্ভুজের বিপরীত বাহু জোড়া পরস্পর সমান এবং সমান্তরাল তাদের সামন্তিরক বলে। সামান্তরিকের বিপরীত কোণ দুটি পরস্পর সমান হয়। (চিত্র-ক)

সামান্তরিক চতুর্ভুজের বৈশিষ্ট্য:-

  • সামান্তরিক চতুর্ভুজের বিপরীত দিক একই দৈর্ঘ্যের
  • বিপরীত দিকগুলি একে অপরের সমান্তরাল
  • একটি সামান্তরিক চতুর্ভুজের কর্ণ পরস্পরকে দ্বিখণ্ডিত করে
  • বিপরীত কোণগুলি সমান পরিমাপের
  • একটি সামান্তরিক চতুর্ভুজের দুটি সন্নিহিত কোণের সমষ্টি 180 ডিগ্রির সমান

আয়ত:

যে চতুর্ভুজের বিপরীত বাহুগুলোর দৈর্ঘ্য সমান এবং প্রত্যেকটি কোণ এক সমকোণ তাকে আয়ত বা আয়তক্ষেত্র (Rectuagle) বলে। (চিত্র-খ)

সামান্তরিকের একটি কোণ সমকোণ হলে, তাকে আয়ত বলা হয়। উল্লেখ্য যে, সামান্তরিকের একটি কোণ সমকোণ হলে, সব কোণই সমকোণ হয়।

আয়তক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য:-
  • একটি আয়তক্ষেত্রের বিপরীত বাহুগুলি সমান দৈর্ঘ্যের
  • বিপরীত দিকগুলি একে অপরের সমান্তরাল
  • একটি আয়তক্ষেত্রের সমস্ত অভ্যন্তরীণ কোণ 90 ডিগ্রি।
  • একটি আয়তক্ষেত্রের কর্ণ পরস্পরকে দ্বিখণ্ডিত করে।

বর্গক্ষেত্র :

যে চতুর্ভুজের প্রত্যেকটি বাহু পরস্পর সমান এবং প্রত্যেকটি কোণ এক সমকোণ তাকে বর্গ বা বর্গক্ষেত্র (Square) বলে। (চিত্র-গ)

আয়তের কোনো এক শীর্ষগামী বাহুদ্বয় সমান হলে, তাকে বর্গ বলা হয়। উল্লেখ্য যে, আয়তের কোনো এক শীর্ষগামী বাহুদ্বয় সমান হলে, তার সকল বাহু সমান হয়।

বর্গক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য:-
  • বর্গক্ষেত্রের সমস্ত দিক সমান পরিমাপের
  • পক্ষগুলি একে অপরের সমান্তরাল
  • একটি বর্গক্ষেত্রের সমস্ত অভ্যন্তরীণ কোণ 90 ডিগ্রিতে (অর্থাৎ, সমকোণ)
  • একটি বর্গাকার লম্বের কর্ণ পরস্পরকে দ্বিখণ্ডিত করে

রম্বস :

যে চতুর্ভুজের প্রত্যেকটি বাহু পরস্পর সমান কিন্তু একটি কোণও এক সমকোণ নয় তাদের রম্বস (Rhombus) বলে। রসের বিপরীত কোণ দুটি পরস্পর সমান হয়। (চিত্র-ঘ)

সামান্তরিকের কোনো এক শীর্ষগামী বাহুদ্বয় সমান হলে এবং একটি কোণ সমকোণ না হলে, তাকে রম্বস বলা হয়।

উল্লেখ্য যে, সামান্তরিকের কোনো এক শীর্ষগামী বাহুদ্বয় সমান হলে তার সব বাহু সমান হয় এবং একটি কোণ সমকোণ না হলে কোনো কোণই সমকোণ হয় না।

রম্বসের বৈশিষ্ট্য :-
  • একটি রম্বসের চারটি বাহু একই পরিমাপের
  • রম্বসের বিপরীত বাহু একে অপরের সমান্তরাল
  • বিপরীত কোণগুলি একই পরিমাপের
  • একটি রম্বসের যেকোনো দুটি সন্নিহিত কোণের সমষ্টি 180 ডিগ্রির সমান
  • কর্ণগুলি লম্বভাবে পরস্পরকে দ্বিখণ্ডিত করে

ট্রাপিজিয়াম :

যে চতুর্ভুজের বিপরীত এক জোড়া বাহু পরস্পর সমান্তরাল কিন্তু সমান নয় তাদের ট্রাপিজিয়াম (Trapezium) বলে। এদের বিপরীত কোণগুলো সমান হয় না। (চিত্র-ঙ)

যে চতুর্ভুজের কেবলমাত্র দুইটি বাহু সমান্তরাল, তাকে ট্রাপিজিয়াম বলা হয়।

ট্রাপিজিয়ামের সমান্তরাল বাহুঘরের একটিকে ভূমি এবং অসমান্তরাল বাহুদ্বয়কে তির্যক বাহু বলা হয়। ট্রাপিজিয়ামের তির্যক বাহুদ্বয় সমান হলে একে সমদ্বিবাহু ট্রাপিজিয়াম বলা হয়।

উল্লেখ্য যে, ট্রাপিজিয়ামের সমান্তরাল বায়ুদয় কখনও সমান হতে পারে না।

ট্রাপিজিয়ামের বৈশিষ্ট্য:-
  • একটি ট্র্যাপিজিয়ামের বিপরীত দিকের শুধুমাত্র একটি জোড়া একে অপরের সমান্তরাল
  • একটি ট্র্যাপিজিয়ামের দুটি সন্নিহিত বাহু সম্পূরক (180 ডিগ্রি)
  • একটি ট্র্যাপিজিয়ামের কর্ণগুলি একই অনুপাতে পরস্পরকে দ্বিখণ্ডিত করে

সরল চতুর্ভুজ :-

একটি সরল চতুর্ভুজ হল এক ধরনের চতুর্ভুজ যার কোন স্ব-ছেদকারী বাহু নেই। এটি উত্তল বা অবতল হতে পারে।

অর্থাৎ যে চতুর্ভুজের একটি বাহু অন্য বাহুর ছেদক হয় না বা অন্য বাহুকে শীর্ষ ব্যতীত অন্য কোন বিন্দুতে ছেদ করে না তাকে সরল চতুর্ভুজ বলে।

উদাহরণ : একটি বর্গক্ষেত্র , একটি আয়তক্ষেত্র , একটি সমান্তরাল চতুর্ভুজ , একটি রম্বস এবং একটি ট্র্যাপিজয়েড হল সরল উত্তল চতুর্ভুজ, যখন একটি ডার্ট বা তীরের মাথা একটি সরল অবতল চতুর্ভুজ।
সরল ও জটিল চতুর্ভুজ

জটিল চতুর্ভুজ :-

যে চতুর্ভুজের একটি বাহু অন্য বাহুর ছেদক হয় অথবা একটি বাহু অন্য বাহুকে শীর্ষ ব্যতীত অন্য কোন বিন্দুতে ছেদ করে তাকে জটিল চতুর্ভুজ বলে।

জটিল চতুর্ভুজ অনেকক্ষেত্রে ক্রস চতুর্ভুজ (cross quadrilateral) বলে সুপরিচিত।

উদাহরণ : একটি ক্রসড ট্র্যাপিজয়েড, একটি ক্রসড- বর্গক্ষেত্র এবং একটি ক্রসড-আয়তক্ষেত্র।

অবতল চতুর্ভুজ:

অবতল চতুর্ভুজগুলিতে, একটি অভ্যন্তরীণ কোণ 180° এর চেয়ে বেশি।

একটি চতুর্ভুজকে অবতল চতুর্ভুজ বলা হয় যদি কমপক্ষে একটি তির্যক হয়, অর্থাৎ শীর্ষবিন্দুগুলির সাথে যুক্ত রেখার অংশটি চতুর্ভুজের একই অঞ্চলের অংশ না হয়।

উত্তল চতুর্ভুজ:

উত্তল চতুর্ভুজে, প্রতিটি অভ্যন্তরীণ কোণ 180° এর কম। একটি চতুর্ভুজ উত্তল হয় যদি তার দুটি শীর্ষবিন্দুর যেকোনো একটিকে যুক্ত করা রেখাটি একই অঞ্চলে থাকে।

অর্থাৎ যে চতুর্ভূজ কর্ণদ্বয় পরস্পরকে ছেদ করে তাকে উত্তল চতুর্ভূজ বলা যায়।

চতুর্ভূজে অর্ন্তদেশ : যে কোনো দুটি বিপরীত কোণের অর্ন্তদেশ সাধারণ অংশ অর্থাৎ অর্ন্তদেশের ছেদকে উত্তল চতুর্ভূজে অর্ন্তদেশ বলা যায়।

চতুর্ভূজের অন্তঃস্থ বিন্দু: অর্ন্তদেশের অবস্থিত বিন্দুকে চতুর্ভূজের অন্তঃস্থ বিন্দু (Interior Point) বলে।

চতুর্ভূজে বর্হিদেশ: চতুভুজে সমতলে থাকা একটি বিন্দু যদি চতুর্ভূজে কোনো বাহু উপরে থাকে না এবং চতুর্ভূজের অর্ন্তদেশের মধ্য থাকে না। তাকে চতুর্ভূজের বহিঃস্থ বিন্দু (Exterior Point) বলে। বহিঃস্থ বিন্দুদের গঠন করে থাকা সেটাতে চতুর্ভূজে বর্হিদেশ (Exterior) বলে।

চতুর্ভুজের বৈশিষ্ট্য :-

  • - চতুর্ভুজে চারটি বাহু থাকে। যেমন: AB, BC, CD, DA
  • - চতুর্ভুজে চারটি শীর্ষবিন্দু থাকে। যেমন: A, B, C, D
  • - চতুর্ভুজে চারটি কোণ থাকে। যেমন: ∠ABC, ∠BCD, ∠CDA, ∠DAB
  • - বিপরীত দুটি কোণ সমকোণ হয়। যেমন: ∠A এবং ∠C
  • - বিপরীত দুটি বাহু সমান্তরাল এবং সমদৈর্ঘ্যের হয়। যেমন: AB এবং CD
  • - সন্নিহিত দুটি বাহুর মধ্যে দৈর্ঘ্য সমান হয়। যেমন: AB এবং BC
  • - চতুর্ভুজের বিপরীত দুটি কোণের যোগ 180 ডিগ্রি হয়।
  • - চারটি কোণের যোগ 360 ডিগ্রি হয়।

এছাড়াও আরও অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে চতুর্ভুজের।

চতুর্ভুজের পরিধি :-

চতুর্ভুজের পরিধি হল এর সীমানার দৈর্ঘ্য। এর মানে একটি চতুর্ভুজের পরিধি সব বাহুর সমষ্টির সমান। যদি ABCD একটি চতুর্ভুজ হয় তবে এর পরিসীমা হবে: AB + BC + CD + DA।

চতুর্ভুজের পরিধি ABCD = AB + BC + CD + DA

কয়েকটি সাধারণ চতুর্ভুজের পরিধির সূত্র নিচে দেওয়া হল:
  • আয়তক্ষেত্র 2 (দৈর্ঘ্য + প্রস্থ)
  • বর্গক্ষেত্র 4 x সাইড
  • রম্বস 4 x সাইড
  • সমান্তরাল বৃত্ত সন্নিহিত বাহুর 2 x সমষ্টি
  • ঘুড়ি সন্নিহিত বাহুর 2 x সমষ্টি

চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল :-

চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল হল এর সমস্ত দিক দিয়ে ঘেরা অঞ্চল। বিভিন্ন ধরনের চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রগুলো নিচে দেখানো হলো:
চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফল

চতুর্ভূজাকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্র (Quadrilateral Region) :

একটি ত্রিভুজ ও এর অর্ন্তদেশ সংযোগের উৎপন্ন সেটকে একটি ত্রিভুজাকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্র (Triangular Region) বলা যায় এবং ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দু কোন ও বাহুদের যথাক্রমে এই ত্রিভুজাকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্রের শীর্ষবিন্দু, কোন ও বাহু বলা যায়।

(a) একটি চতুর্ভূজ ও এর অর্ন্তদেশ যে সংযোগে উৎপন্ন সেটকে একটি চতুর্ভুজ আকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্র বলা যায়।

(b) চতুর্ভুজদ্বয়ের শীর্ষবিন্দু কোন ও বাহুদের যথাক্রমে এই চতুর্ভুজাকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্রে শীর্ষবিন্দু কোন ও বাহু বলা যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ