প্রতিবেদন কি বা কাকে বলে? প্রতিবেদন কয় প্রকার ও কী কী? প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্য

ইংরেজি রিপোর্ট (Report) শব্দটির বাংলা পরিভাষা হলো প্রতিবেদন। এই “Report" শব্দটি ফরাসি শব্দ “Rapportes" হতে উৎপত্তি হয়েছে। আবার অনেকের মতে ইংরেজি Report শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Reporlare হতে এসেছে। রিপোর্ট শব্দটির অর্থ বিবরণ, বিবৃতি কোনো তথ্য, ঘটনা বা বক্তব্য সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দেয়ার নাম প্রতিবেদন

প্রতিবেদন যিনি রচনা বা তৈরি করেন তাকে বলা হয় প্রতিবেদক বা রিপোর্টার। প্রতিবেদককে সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে তথ্য, উপাত্ত, সিদ্ধান্ত, মূল্যায়ন, ফলাফল ইত্যাদি অনুসন্ধানের পর কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য পেশ করতে হয়।

সংবাদপত্রে প্রতিদিন এরকম অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এধরনের প্রতিবেদনে প্রতিবেদকের নিজস্ব চিন্তাধারা বা মূল্যায়ন প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন :- শুদ্ধ বানানরীতির নিয়ম সমূহ?

তবে অন্যান্য প্রতিবেদনে প্রতিবেদকের নিজস্ব ধারণা, চিন্তা ও মূল্যায়ন থাকতে পারে। সেই কারণে অনেকে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের সঙ্গে অন্যান্য প্রতিবেদনের পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন।

প্রতিবেদন কি বা কাকে বলে :-

প্রতিবেদন কাকে বলে এসম্পর্কে প্রফেসর মাইক হ্যাচ বলেছেন -
"প্রতিবেদন হলো একটি সুসংগঠিত প্রথাগত বিবৃতি, যা কোন ঘটনা বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সঠিক ও তথ্যবহুল বর্ণনা প্রদান করে থাকে”।
প্রতিবেদন

অধ্যাপক ভট্টাচার্য এর মতে প্রতিবেদন -
“কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা ঘটনা সম্পর্কে যথাযথ অনুসন্ধানের পর ঐ বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট উৎসুক কোন ব্যক্তির নিকট যে ধারাবাহিক বা চুক্তিবদ্ধ বিবরণী পেশ করা হয়, তাকেই প্রতিবেদন বলা হয় "


S. A. Taintor এর মতে প্রতিবেদন কি এর উত্তরে বলেছেন -
“Report is careful and accurate presentation of facts or statistics compiled or conditions or operations studied for the purpose of informing those desiring such information”.


G. R. Terry বলেছেন -
“A Report is a formal presentation of summary information dealing with utilization of resources or status of operation useful in evaluation progress making decisions and directing activities.”


প্রতিবেদন কয় প্রকার ও কি কি :-

প্রতিবেদনকে বিভিন্ন ভাবে শ্রেনীবিভাগ করেছেন। যেমন -

উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনের শ্রেণীবিভাগ :-

উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
  1. তথ্যমূলক প্রতিবেদন, ও
  2. বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন।
আকার আকৃতির ভিত্তিতে প্রতিবেদনের প্রকারভেদ :-

আকার আকৃতি বা গঠন প্রকৃতির ভিত্তিতে প্রতিবেদনকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ
  1. আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন, এবং
  2. অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদন।

আরও পড়ুন :- ভাষন দেওয়ার নিয়ম?

প্রতিবেদনের বৈশিষ্ট্য :-

  1. কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রতিবেদন রচনা করতে হবে।
  2. প্রতিবেদনে তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠতা থাকতে হবে।
  3. প্রতিবেদন হবে সহজ, সরল ও যুক্তিপূর্ণ। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে প্রতিবেদন রচনা করা যাবে না।
  4. আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রতিবেদন রচনা করা ঠিক নয়।
  5. প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু বিশেষ কয়েকটি অনুচ্ছেদে ভাগ করে তৈরি করা যেতে পারে।
  6. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই প্রতিবেদনে প্রধানভাবে আলোচিত হবে।

বিশ্লেষণত্মক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম :-

একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ থাকে। প্রতিটি অংশ যথাযথভাবে পূরণ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হলে তা সার্থক ও যথার্থ হবে। নিম্নে একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন লেখার নিয়ম বা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলো-

শিরোনাম (Title of the report) :-

প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুকে এককথায় প্রকাশ করে এমন একটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় শিরোনাম দিতে হবে। এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ। শিরোনাম সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পাঠকগণ শিরোনাম দেখেই প্রতিবেদনের মূলবিষয়বস্তু সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করতে পারে।

শিরোনাম পাতা (Title page of the report) :-

শিরোনাম পাতায় প্রতিবেদকের নাম, ঠিকানা, পদবী, যার কাছে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হবে তাঁর নাম, ঠিকানা, পদবী প্রভৃতি উল্লেখ করা থাকে।

সূচীপত্র (Index) :-

ছোট প্রতিবেদনে সূচিপত্র না থাকলেও চলে, কিন্তু বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনের বিভিন্ন ইউনিট বা অধ্যায়গুলো পৃষ্ঠা নম্বরসহ উল্লেখ করতে হয়।

সার-সংক্ষেপ (Summary) :-

প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু সংক্ষিপ্ত আকারে অংশের মধ্যে লিখতে হয়। প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, সুপারিশ, পরামর্শ মতামত ইত্যাদি সংক্ষিপ্ত আকারে এই অংশে লেখা থাকে। ব্যস্ত পাঠকগণ সারসংক্ষেপ পড়ে মূল প্রতিবেদনের সম্পর্কে ধারনা লাভ করতে পারে।


২. মূল অংশ

মূল বক্তব্য (Main body) :-

একটি বিশেষণাত্মক প্রতিবেদনের প্রধান ও অপরিহার্য অংশ হলো মূল বক্তব্য বা গর্ভাংশের অংশটুকু। প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই অংশে বিভিন্ন শিরোনাম বা উপশিরোনামে উপস্থাপন করতে হয়।

মূল বক্তব্য রচনা করার সময় প্রতিবেদককে খেয়াল রাখতে হবে কোন অনুচ্ছেদ যেন অতি বড় না হয়, পক্ষান্তরে কোন অনুচ্ছেদ যেন প্রতিবেদন হতে বাদ না পড়ে।

উপসংহার (Conclusion) :-

প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদকে একটি উপসংহার তৈরি করতে হয়। উপসংহারে প্রতিবেদক অত্যন্ত সুচিন্তিত ও নিরপেক্ষ ভাবে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর উপর তার মন্তব্য প্রকাশ করেন।

সুপারিশমালা (Recommendations) :-

প্রতিবেদনে সুপারিশ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক নহে। অবশ্য সুপারিশের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের চাহিদার উপর নির্ভর করে। যদি কর্তৃপক্ষ সুপারিশসহ প্রতিবেদন পেশ করতে নির্দেশ দেন তাহলে সুপারিশ উল্লেখ করতে হয়, অন্যথায় নয়।

৩. প্রতিবেদনের পরিশিষ্টাংশ

পরিশিষ্ট (Appendix) :-

এই অংশটি প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবেদনটি পাঠকদের নিকট সহজ ও বোধগম্য করে তোলার নিমিত্তে বিভিন্ন ছক, চার্ট, তালিকা, চিত্র, নকশা ইত্যাদি এই অংশে উল্লেখ করতে হয়।

একটি প্রতিবেদন সম্পর্কে যথাযথভাবে অনুধাবন করা, প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর সত্যতা প্রত্যয়ণ করার ব্যাপারে পরিশিষ্ট অংশটি পাঠকদের সহায়তা করে।

গ্রন্থপুঞ্জ (Bibliography) :-

প্রতিবেদন তৈরির সময় যে সব পুস্তিকা, বই, সাময়িক, প্রবন্ধ, খবরের কাগজ ইত্যাদির যে সহায়তা নেয়া হয়েছে, সে সবের একটি তালিকা গ্রন্থপুঞ্জতে উল্লেখ করতে হয়।

এখানে লেখকের নাম, বইয়ের নাম, প্রকাশনার স্থান, কাল ও পৃষ্ঠার নম্বর একটি বিশেষ পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করতে হয়।

প্রতিবেদকের স্বাক্ষর (Signature of the reporter) :-

প্রতিবেদন শেষে প্রতিবেদককে স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। প্রতিবেদনটি যদি টিম বা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয় তাহলে টিম বা কমিটির সকল সদস্যকে প্রতিবেদনের শেষে স্বাক্ষর করতে হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ