বাজারজাতকরণ বা বিপণন এর সংজ্ঞা

বাজারজাতকরণ বা বিপণন কাকে বলে :-

বাজারজাতকরণ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কারো কারো মতে, বাজারজাতকরণ হলো ক্রয়বিক্রয় করা আবার কারো মতে, পণ্যসামগ্রী পরস্পরের মধ্যে বিনিময় করাই হলো বাজারজাতকরণ।

কোনো কোনো ব্যক্তি বাজারজাতকরণকে ব্যবসায়িক কার্যাবলি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তাদের মতে, উৎপাদকের নিকট থেকে ভোক্তার নিকট পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে যেসব ব্যবসায়িক কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয় সেগুলোর সামগ্রিক রূপই হলো বাজারতাজকরণ বা বিপণন।

বাজারজাতকরণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের কয়েকটি সময়োপযোগী সংজ্ঞা নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো।

বাজারতাজকরণ বিশেষজ্ঞ ফিলিপ কটলার ও গ্যারি আর্মস্ট্রং (Philip Kotler and Gary Armstrong) এর মতে, "বাজারজাতকরণ হচ্ছে একটি সামাজিক ও ব্যবস্থাপকীয় প্রক্রিয়া যার দ্বারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পণ্যের উৎপাদন, মূলা সৃষ্টি কিংবা অন্যের সঙ্গে বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন এবং অভাব পূরণ করে।"

উইলিয়াম জে, স্ট্যান্টন (William J. Staton) এর মতানুসারে, "বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের চাহিদা মেটাবার উপযোগী পণ্য ও সেবার পরিকল্পনা মূল্য নির্ধারণ, প্রসার ও বন্টনের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত ব্যবসায়িক কার্যকলাপের সামগ্রিক ব্যবস্থা হলো বাজারজাতকরণ।"

এফ. ই. ক্লার্স ও সি. পি. ক্লার্ক (FE. Clark and c. P. Clark) এর বক্তব্য অনুসারে, "পণ্য ও সেবার মালিকানা হস্তান্তর এবং এদের বাস্তব বণ্টনে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণকারী প্রচেষ্টার সমাহারকে বাজারজাতকরণ বলে।"
বাজারজাতকরণ বা বিপণন কি

উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে বাজারজাতকরণের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠে।

১. বাজারজাতকরণ একটি সামাজিক ও ব্যবস্থাপকীয় প্রক্রিয়া।

২. এটি ব্যবসায়িক ও অধ্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত।

৩. এটি একটি বিনিময় ও বণ্টনগত প্রক্রিয়।

৪. এটি চাহিদা পূরণের সাথে জড়িত।

৫. এটি মালিকানা হস্তান্তরগত একটি প্রক্রিয়া।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা বাজারজাতকরণকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি এভাবে, যে প্রক্রিয়ার দ্বারা পণ্য ও সেবার মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে চাহিদার পরিতৃপ্তি সাধন করা হয় এবং চাহিদাকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাকে বাজারজাতকরণ বা বিপণন বলে।

আরও পড়ুন:- মধ্যস্থব্যবসায়ী কাকে বলে?

বাজারজাতকরণের কার্যাবলি :-

সাধারণ অর্থে বাজারজাতকরণ কার্য বলতে শুধু ক্রয় বা বিক্রয়কেই বোঝানো হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাজারজাতকরণ কার্যের পরিধি আরও বিস্তৃত। বাজারজাতকরণ উৎপাদকের নিকট থেকে পণ্য বা সেবাসামগ্রী ভোক্তা বা ব্যবহারকারীর নিকট পৌঁছাবার সাথে সম্পৃক্ত সকল কার্যবিলি সম্পাদন করে থাকে।

অধ্যাপক কনভার্স ও তার সহযোগীদের মতে, “বাজারজাতকরণ ব্যবসায়ের ঐ সমস্ত কার্যাবলির সমষ্টি যা উৎপাদনকারী ও ভোগকারীদের মধ্যে পণ্যসামগ্রী ও সেবাকর্মাদি পৌঁছে দেয়।"
বাজারজাতকরণের কার্যাবলি
নিম্নে বাজারজাতকরণের কার্যাবলি আলোচিত হলো:

ক. বিনিময় কার্যাবলি (Functions relating to exchange)

১. ক্রয় (Buying) :-

ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ক্রয় করাই বাজারজাতকরণের প্রথম কাজ। উৎপাদকারীগণ তাদের উৎপাদন কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয় করে থাকে। আবার ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও ক্রয় কার্যের দরকার হয়। এ ক্রয়ের মাধ্যমেই ক্রেতা পণ্যের ওপর মালিকানা লাভ করে।

২. বিক্রয় (Selling) :-

বাজারজাতকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিক্রয়। পণ্যের সত্ব হস্তান্তর, চাহিদা সৃষ্টি, ক্রেতা অনুসন্ধান, ক্রেতার প্রয়োজনের সাথে বিক্রেতার পণ্যের সামঞ্জস্য রক্ষা এবং বিক্রয় শর্ত নিরুপণ ইত্যাদি বিক্রয়ের অন্তর্ভুক্ত। চূড়ান্ত বিক্রয় কার্য সম্পাদনের জন্য চাহিদা সৃষ্টির সাথে সাথে পণ্য ক্রয়ের জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজে বের করতে হয়।

খ. বণ্টন কার্য (Functions relating to physical supply) :-

১. পরিবহন (Transportation) :-

উৎপাদনের স্থান থেকে ভোগের স্থানে পণ্য স্থানান্তর করে পরিবহন পণ্যটির স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি করে। পরিবহন বাজারজাতকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংগ। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা বাজারের পরিধি স্থানীয় এলাকা থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল সম্প্রসারিত করে।

২. গুদামজাতকরণ (Warehousing) :-

উৎপাদনের পর পণ্যসামগ্রী ব্যবহার হওয়া পর্যন্ত মজুদ রেখে গুদামজাতকরণ পণ্যের সময়গত উপযোগ সৃষ্টি করে। বাজারজাতকরণের প্রায় প্রত্যেক পর্যায়েই পণ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। যেসব পণ্যের চাহিদা সারা বছর থাকে অথচ একটি বিশেষ মৌসুমে উৎপাদিত হয় সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। পণ্যের সংরক্ষণ কার্যে উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, পণ্যাগার সংস্থা ইত্যাদি বিভিন্ন পক্ষ সম্পৃক্ত থাকে।

আরও পড়ুন:- ক্রেতা ও ভোক্তার মধ্যে পার্থক্য কি?

৩. প্যাকেজিং (Packaging) :-

স্থানান্তরের সময় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা এবং ভোক্তা ও ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য পণ্য প্যাকিং বা মোডুকিকরণ করা হয়। এছাড়া চাহিদামাফিক পণ্য যাতে ক্রেতা দ্রুত পেতে পারেন সেজন্যও পণ্যকে পরিমাণ মতো প্যাকিং করে রাখা হয়। শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে মোড়কিকরণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

গ. ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলি (Managerial functions) :-

১. বাজার তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা (Collection of market information and research) :-

ব্যবসায়ের নীতি প্রণয়ন ও পরিচালনার জন্য বাজার তথ্যের প্রয়োজন হয়। বাজার তথ্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে, ঝুঁকি হ্রাসে সাহায্য করে, উৎপাদনের পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা পালন করে, চাহিদা ও সরবরাহে সমতা বিধান করে এবং ব্যবসায়ীকে সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ করে। এছাড়া পণ্য পরিকল্পনা ও পণ্যের মান উন্নয়ন, নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন ইত্যাদি কাজে পণ্য গবেষণারও দরকার হয়।

২. বাজার বিভাজন (Market segmentation) :-

পণ্যের বাজারে বিভিন্ন শ্রেণির ভোক্তা থাকে। প্রয়োজন, বৈশিষ্ট্য এবং আচরণের ওপর ভিত্তি করে তাদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এটিই বাজার বিভাজন বা বাজার বিভক্তিকরণ। ক্রেতাদের কাছে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই বাজার বিভাজন করা হয়।

৩. মূল্য নির্ধারণ (Pricing) :-

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রতিযোগী পণ্য ক্রেতাদের চাহিদা, পণ্যের উৎপাদন, ব্যয় ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ব্যবস্থাপকগণ পণ্যের এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করেন যাতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থই রক্ষিত হয়।

৪. বিজ্ঞাপন ও বিক্ৰয়িকতা (Advertising and salesmanship) :-

বিজ্ঞাপন ও বিক্ৰয়িকতা ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ক্রেতাগণ বিজ্ঞাপন ও বিক্রয়িকতা কার্যের দ্বারা ক্রেতা সৃষ্টি করে তাকে স্থায়ী গ্রাহকে পরিণত করে।

ঘ. সহায়ক কার্যাবলি (Facilitating functions) :-

১. অর্থসংস্থান (Financing) :-

পণ্য উৎপাদনের পর ভোক্তাদের হাতে পৌঁছানোর জন্য গুদামজাতকরণ, পরিবহণ, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয়। আর এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। শেয়ার বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত মূলধন, ঋণদানকারী সংস্থা ইত্যাদি বাজারজাতকরণের অর্থসংস্থান করে থাকে।

আরও পড়ুন:- মার্কেটিং কি?

২. ঝুঁকি গ্রহণ (Risk-taking) :-

বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়েই ঝুঁকি বিদ্যামন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, ঝড়, চুরি, ডাকাতি, তহবিল তছরুপ, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উদ্ভব ঝুঁকি ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সময়গত, স্থানগত ও প্রতিযোগিতাগত ঝুঁকি। এসব ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষার জন্য গৃহীত পন্থাসমূহ বাজারজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিমাকরণ ও অন্যান্য বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করে এসব ঝুঁকি হ্রাস করা হয়ে থাকে।

৩. প্রমিতকরণ ও পর্যায়িতকরণ (Standardization and grading) :-

বাজারজাতকরণ কার্যে গতিশলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পণ্যসামগ্রীর কতিপয় সাধারণ বৈশিষ্ট্যে ওপর ভিত্তি কওে পণ্যের মান নির্ধারণ করা হয়। এ মান নির্ধারণকে প্রমিতকরণ বলা হয়। প্রতিষ্ঠিত মান অনুসারে পণ্যসামগ্রীকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্তি করার নাম পর্যায়িতকরণ। পণ্য সুনির্দিষ্ট মান অনুযায়ী পর্যায়িত হলে ভোক্তাগণ একইমানের পণ্য বিনা পরিদর্শনে বারবার ক্রয় করতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ