ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য আলোচনা কর | ব্যবসায়ের কার্যাবলী বর্ণনা করো

জীবিকা অর্জনের সবচেয়ে স্বাধীন, সহজতম ও সম্মানজনক উপায় হলো ব্যবসায়। ব্যবসায়ের মাধ্যমে ধন সম্পদ অর্জন করে নিজের, সমাজের তথা দেশের অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব। বিশ্বের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সব কিছুই ব্যবসায় দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত।

চলমান বিশ্বের সব কিছুই থেমে যাবে যদি ব্যবসায় থেমে যায়। বিশ্বের প্রতিটি মানুষই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ব্যবসায় দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। প্রতিটি দেশই ব্যবসায় বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ের কার্যাবলি এবং এর পরিধি সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই আমাদের জেনে নেয়া দরকার ব্যবসায় কী উদ্দেশ্যে সংগঠিত হয়।

এই পোস্টে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য আলোচনা করা ও ব্যবসায়ের কার্যাবলী বর্ণনা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:- ব্যবসায় অর্থ সংস্থানের উৎস?

ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য :-

ব্যবসায় সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার পেছনে মানুষের কতিপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্দেশ্য জড়িত থাকে। তবে ব্যবসায়ের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন। এটি ব্যবসায়ের প্রধানতম প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য হলেও বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যকে ঘিরে ব্যবসায় পরিচালিত হতে পারে না।

একজন ব্যবসায়ীকে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি ক্রেতা, সমাজ ও সরকারের দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে বহুমুখী। নিম্নে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করা হলো:
ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য
১. মুনাফা অর্জন (Making profit) :-

ব্যবসায়ী তার মূলধন বিনিয়োগ করে নিজ শ্রম ও মেধা দিয়ে ব্যবসায় গঠন ও পরিচালনা করেন শুধুমাত্রই অধিক অর্থ লাভের আশায়। মুনাফাই ব্যবসায়ীর প্রধানতম লক্ষ্য। মুনাফা অর্জন ব্যতীত কোনো ব্যবসায় পরিচালিত হতে পারে না।

২. মূলধন বিনিয়োগ ( Investment of capital) :-

ব্যবাসায়ী প্রথমত, নিজের সঞ্চিত মূলধন ছাড়াও সারাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংকিং ব্যবসায়ের মাধ্যমে একত্রিত করে মূলধন গঠন করে। এতে ক্ষুদ্র সঞ্চলকারী হতে শুধু করে পণ্য বা সেবার ভোক্তা পর্যন্ত উপকৃত হয়ে থাকেন।

৩. সম্পদের সুষম ব্যবহার (Proper Utilization of wealth) :-

মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রতিটি মানুষকেই অপরের উৎপাদন বা সেবার ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে উৎপাদনকারীর পণ্য প্রকৃত ব্যবহারকারীর হাতে পৌঁছে দিয়ে ব্যবসায় দেশের সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করছে।

৪. নতুন উদ্ভাবন (Innovation) :-

মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে একজন ব্যবসায়ী জনগণের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনের ব্যবস্থা করেন। ফলে এটি সমাজরে প্রয়োজনের তালিকায় একটি বিশেষ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।


৫. জনগণের আয় বৃদ্ধি (Increase of income of the people) :-

ব্যবসায় একদিকে যেমন এর মালিক এবং কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, অন্যদিকে ন্যায্য মূল্যে পণ্যসামগ্রী কিনতে পারায় দেশের জনগণের অর্থ বেঁচে যাবার কারণে তাদেরও আয় বৃদ্ধি পায়। ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মানেরও উন্নয়ন ঘটে।

৬. সমাজের চাহিদা পূরণ (Fulfilment of social demand) :-

সমাজের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ী নিজে পণ্য দ্রব্য উৎপাদান করে, সংরক্ষণ করে, পরিবহন করে এবং ক্রেতার সন্নিকটে সরবরাহের নিশ্চয়তাসহ মজুদ রাখে। এটি সমাজবদ্ধ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাবার নিশ্চয়তাও দেয়।

৭. পণ্যের যথাযথ বণ্টন (Proper distribution of product) :-

পণ্যসামগ্রী কোনো একটি বিশেষ স্থানে উৎপাদিত হলেও তা সময় দেশের জনগণ ভোগ করে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবসায় প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন অনুসারে পণ্যসামগ্রী উৎপাদান স্থল থেকে বণ্টন করে এবং সকলের চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

৮. কর্মসংস্থান (Employment) :-

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নিজের এবং সমাজবদ্ধ অন্যান্য বেকার লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে। এতে দেশের বেকার ও অদক্ষ লোজন সুদক্ষ হয়ে ওঠে এবং তারা উৎপাদান কাজে অংশ নিতে পারে।

৯. সমাজকল্যাণে অংশগ্রহণ (Participation in social welfare) :-

সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে, ধর্মীয়, জনহিতকর বা সামাজিক অন্যান্য আচার অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ সাহায্য দানের মাধ্যমে ব্যবসায় সমাজকল্যাণে অংশ নিয়ে থাকে।

১০. সমাজবিরোধী কাজ না করা (Refraining from anti-social work) :-

হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে কালোবাজারি, চোরাকারবারি, অহেতুক প্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করা হতে বিরত থাকা ব্যবসায়ের মৌলিক দীক্ষা।

১১. শ্রমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে উন্নয়ন (Development of labour management relationship) :-

প্রতিষ্ঠানে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা শ্রমিক-কর্মীদের কল্যাণার্থে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেন।

যেমন- বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য রক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ ইত্যাদি। এতে শ্রমিক কর্মীরা অনুপ্রেরণা পায়। ফলে শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে।


১২. ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন (Relation with customers) :-

ব্যবসায়ের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা। ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়ন করেন।

১৩. জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Development of national economy) :-

জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুসারে উৎপাদন, বণ্টন, পরিবহন ইত্যাদি কার্য পরিচালনা করে ব্যবসায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করে।

১৪. জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি (Increase of national resources) :-

ব্যবসায়ী ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন কার্য পরিচালনা করে থাকেন। এর ফলে জাতীয় সম্পদ বেড়ে যায় এবং দেশ উন্নতির দিকে ধাবিত হয়।

১৫. জাতীয় সম্পদের ব্যবহার (Use of national resources) :-

দেশের সর্বপ্রকার প্রাকৃতিক সম্পদাদি আহরণ এবং ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ঐ সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য। অনুরূপ সম্পদের ব্যবহার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে।

সুতরাং কেবল মুনাফা অর্জনই ব্যবসায়ের উদ্দেশ নয়, সমাজের মানুষের বিভিন্নমুখী চাহিদা পূরণের মধ্যেই ব্যবসায়ের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। অর্থ উপার্জনের সাথে সাথে সামাজিক ও জাতীয় কল্যাণ সাধনের মধ্যে ব্যবসায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিহিত।

ব্যবসায়ের কার্যাবলী :-

মুনাফা অর্জন, সেবা প্রদান ও জাতীয় উন্নয়নের জন্য ব্যবসায় কতিপয় কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে। ব্যবসায়ের এসব কার্যাবলী নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. সাংগঠনিক কার্যাবলী (Organisation functions) :-

উৎপাদনের উপাদানগুলো (অর্থাৎ ভূমি, শ্রম, মূলধন) একত্রে সন্নিবেশ এবং দক্ষতার সাথে আরম্ভ ও পরিচালনা ব্যবসায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

২. পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ (Supply of products) :-

ভোক্তাদের প্রয়োজনকে সামনে রেখে ব্যবসায় বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নানাবিধ পণ্য দেশের বা বিদেশের বিভিন্ন স্থান হতে সংগ্রহ করে ক্রেতার নিকটতম বিক্রয়কেন্দ্রে মজুদ রাখে।

৩. উৎপাদন কার্য পরিচালনা (Administering production function) :-

প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ বা উত্তোলন করে ভোক্তাদের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে এগুলোকে ব্যবহারোপযোগী করার জন্য ব্যবসায় উৎপাদন কার্য পরিচালনা করে থাকে। এ কাজকে রূপগত উপযোগিতা সৃষ্টিও বলা হয়ে থাকে।

8. পরিবহন (Transportation) :-

সাধারণত পণ্যসামন্ত্রী দেশের বিশেষ বিশেষ এলাকায় উৎপাদিত হয় এবং তা দেশের বিভিন্ন অংশে ভোগ করা হয়। এমতাবস্থায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহণের মাধ্যমে উৎপাদন কেন্দ্র হতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে ভোক্তাদের কাছাকাছি মজুদ করা হয়। এ কাজকে পণ্যের স্থানগত উপযোগিতা সৃষ্টি বলা হয়। পণ্যসামগ্রীকে স্থানান্তরে পরিবাহিত করা হলেই তা ভোগে লাগানো সম্ভব হয়।

৫. গুদামজাতকরণ (Warehousing) :-

সময় পণ্যসামগ্রী উৎপাদনের পর একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ক্রেতাদের ভোগে আসে। যেমন, গরমকালে উৎপাদিত শীতবস্ত্র পরবর্তী সময়ে বিক্রয় করা হয়। উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যবর্তী পর্যায়ে পণ্য গুদামজাত করে রাখা হয়। আর গুদামজাতকরণ ব্যবসায়েরই কাজ।

৬. মালিকানা হস্তান্তর (Transfer of ownership) :-

ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রীর মালিকানা উৎপাদকের নিকট থেকে ব্যবহারকারী বা ভোক্তার নিকট হস্তান্তর করা হয়।

৭. অর্থ সরবরাহ (Supply of money) :-

ব্যবসায়ের প্রয়োজন অনুসারে ব্যাংকিং-এ নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে ব্যবসায় বাণিজ্যকে গতিশীল করে তোলে।

৮. ঝুঁকি হস্তান্তর (Supply of money) :-

ব্যবসায়ের মাধ্যমে ব্যবসা সংক্রান্ত বহুবিধ ঝুঁকিও হস্তান্তরিত হয়। পা বহনকালে কিংবা ব্যবসায় পরিচালনাকালে অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, ভূমিকম্প, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি কারণে যেসব ঝুঁকির সৃষ্টি হয় বিমা কোম্পানি সেসব ঝুঁকির দায়িত্ব গ্রহণ করে।

৯. ক্রয়-বিক্রয় (Buying and selling) :-

ব্যবসায়ের অন্যতম প্রধান কাজ হলো পণ্য ও সেবা ক্রয় ও বিক্রয় করা। সত্যিকার অর্থে, পণ্য ও সেবোর ক্রয়বিক্রন ব্যবসায়ের প্রাণস্বরূপ।

১০. পণ্যের যোগান দান (Supply of commodities) :-

ব্যবসায় সাময়িকভাবে জনগণের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী পণ্য কিংবা সেবার যোগান দেয়। এভাবে জনগণের অভাব পুরণে ব্যবসায় সহায়তা করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ